The Mighty INDIA CALLING: অ্যাডভেঞ্চারের নাম ‘প্যারাসেইলিং’ এবং ট্রেন ধরার টেনশন (পর্ব ৩০)

পরদিন সকালে ঘুম ভাংলো মজুমদারের কান্নাকাটিতে। মোবাইলটা হারিয়ে যাওয়ার শোকটা এখনও ভুলতে পারছে না ও। তাড়াতাড়ি করে রেডি হয়ে বের হয়ে পড়লাম। আমাদের সবার ইচ্ছা ওল্ড গোয়ায় একবার যাওয়ার। আমি, রুবাইদা, মিম আর অন্তরা মিলে হাঁটা দিলাম মেইন রাস্তার দিকে। ডক্টর আলফনসো রোডের মোড়ে বেশ কয়েকটা ট্যাক্সি দাঁড়িয়ে ছিলো। আমাদের দেখে এগিয়ে আসলো। ওল্ড গোয়ায় যাবো শুনে সবাই খুব আগ্রহ দেখালো। কিন্তু দাম চাইলো আকাশ্চুম্বী। সব চেয়ে কম যেটা চাইলো সেটাই ছিলো ১০০০ রুপি। ট্যাক্সি ভাড়া শুনে আর সময় হিসাব করে আমরা সিদ্ধান্ত নিলাম যে ওল্ড গোয়ায় আর যাওয়া যাবে না। এতে রুবাইদার মন খারাপ হলো সবচেয়ে বেশি। আমরা আবার হেটে হেটে হোটেলের দিকে যেতে লাগলাম।

নাশতা করার জন্য কোন চিন্তা ভাবনা না করেই ভিন্সিস প্লেসে ঢুকে আগের দিনের ব্রেড অমলেট আর সাথে সি ফুড সুপ অর্ডার দিয়ে দিলাম। পেট ভরে নাশতাটাই এত মজা করে খেলাম যে মনে হলো হাঁটাহাঁটি করা প্রয়োজন। ওদিকে সবাইকে দেখছিলাম প্যারাসেইলিং এ যাওয়ার কথাবার্তা বলছে। আমরাও যোগ দিলাম এতে। খাওয়াদাওয়া শেষে বের হয়ে পড়লাম আমরা। প্রথমে গেলাম কাছের কালাঙ্গুটে বিচে। সেখান থেকে হাঁটা ধরলাম বাগা বিচের উদ্দেশ্যে। বাগা বিচে পৌঁছানোর আগেই শুভ, রাজিব, নিলয়কে দেখলাম এক দোকানের সাথে কন্ট্রাক্ট করতে প্যারাসেইলিং এর জন্য। নরমালটা ৬০০ রুপি আর Deep Sea নিলে ৮০০ রুপি। আমরা সবাই নরমালটা নিলাম ৬০০ রুপি দিয়ে। এমনিতেই সাঁতার পারি না, তার উপর Deep Sea, কোন দরকার নাই বাবা!

আমি, নিশাত, পৃথ্বী, রিন্তু, মজুমদার, রুবাইদা, নিলয়, রাজিব, তুষার, শুভ আমরা সবাই মিলে এক সাথে লাইন ধরলাম বোটের জন্য। সেখানে আমাদের বাংলা কথা বলতে দেখে বোটের একজন লোক এগিয়ে আসলো। জানালো তার বাড়ি বরিশাল। এখানেই প্যারাসেইলিংয়ের কাজ করে। বাড়ি যাওয়া হয় না অনেক বছর। আমাদের দেখে বললো, ‘দেশের মানুষ পেয়ে খুব ভালো লাগছে’। আমাদের কয়েকজনকে উনি আশ্বস্ত করলেন যে গোয়ার নাবিকরা অনেক দক্ষ। তাই যত বিপদজনক রাইডই হোক না কেন পর্যটকদের কোন বিপদ হওয়ার আশংকা খুবই কম। একটা স্পিড বোট এসে থামলো। আমরা টকাটক উঠে পড়লাম সেই বোটে। বোট আমাদের নিয়ে ছুটলো সৈকত থেকে দূরে।

বড় বড় ঢেউয়ের ঝাকুনি খেয়ে আমরা গিয়ে থামলাম আরেকটা বোটের পাশে। এই বোটটা বড়। আমরা সবাই গিয়ে উঠলাম সেই বোটে। আমাদের নামিয়ে দিয়ে স্পিড বোট চলে গেলো। আমাদের সবাইকে লাইফ জ্যাকেট পরতে বলা হলো। আমরা সবাই গলা ঢুকিয়ে দিলাম লাইফ জ্যাকেটের ফোকড়ে। আমাদের সামনেই দুজন লোক মিলে রঙ্গিন প্যারাসুট বের করলো। তারপর সেটা কপিকলের সাথে ঠিকমত বাঁধাছাদা করতে লাগলো। তারপর ছেড়ে দিতেই ফুলে ফেঁপে সেটা একটা বিশাল রঙ্গিন বেলুনের আকার ধারন করলো। সব দড়িটড়ি ঠিক ঠাকমত চেক করে লোকগুলো তারপর আমাদের দিকে তাকালো। সবার আগে নিলয় এগিয়ে গেলো। নিলয়কে কপিকলের কোথায় জানি আটকে দিলো। যেই বোটটাকে চালাতে লাগলো আর ওমনি নিলয় সাঁ করে উড়ে গেলো। ঠিক উড়ে চলে গেলো না, দড়ি দিয়ে বাঁধা অবস্থায় বোটের উপর ভাসতে লাগলো। আমরা নিচ থেকে হাঁ করে দেখতে লাগলাম। ঠিক কয়েক সেকেন্ডের মধ্যেই নিলয় আবার নেমে আসলো। তারপর ঠিক একইভাবে পৃথ্বী, নিশাত আর মজুমদার উড়ে গেলো কয়েক সেকেন্ডের জন্য। আমরা নিজেরা একবার ‘ডিপ সি’র কথা বলাবলি করছিলাম, তখন মোটা লোকটা জোরে জোরে আমাদের আশ্বস্ত করতে লাগলো, ‘ কোয়ি রিস্ক নেহি, বিল্কুল সেফ হ্যায়, সুইমিং কি কোয়ি জরুরাত নেহি, বহত আচ্ছা হ্যায়’। রাজিবের পালা আসতেই রাজিব ২০০ রুপি হাতে নিয়ে চালক সেই মোটা লোকটার হাতে গুঁজে দিয়ে বললো, ‘ডিপ সি’। লোকটাও মাথা নেড়ে রাজি হয়ে গেলো। তারপর আমরা দেখতে লাগলাম, একইভাবে রাজিবও উড়ে গেলো। উড়ে যেতেই লাগলো অনেক দূর। তারপর প্রচন্ড বেগে ছুটতে ছুটতে আস্তে আস্তে নিচে নামতে লাগলো। নামতে নামতে অর্ধেক ওর ডুবে গেলো পানিতে। তারপর আবার কিছুটা উঠে গেলো উপরে। তারপর একইভাবে আবার নামতে লাগলো পানিতে। ওই অবস্থায় রাজিবকে দেখে আমরা যারা বাকি ছিলাম সবাই পকেট থেকে ২০০ রুপি বের করে হাতে নিয়ে বসে থাকলাম। কেউ আর নরমালটা করতে রাজি না, সবাই ডিপ সি করতে চায়। আমি মনে মনে হাসলাম, এটা তাহলে Deep Sea না হয়ে হবে Dip Sea।

অর্ধেক মানুষের হয়ে গেলে আগের সেই স্পিড বোট নতুন প্যাসেঞ্জার নিয়ে আসলো। যাদের যাদের হয়ে গেছে তারা নেমে গেলো, আর নতুন প্যাসেঞ্জাররা আমাদের সাথে বোটে উঠে আসলো। এক দল ছেলেমেয়ে, আমাদের সমানই হবে হয়তো বয়স। আর আমরাও একেকজনকে পানিতে নাকানি চুবানি খেতে দেখছিলাম আনন্দ নিয়ে। আমার পালা যখন এলো আমি উঠে দাঁড়ালাম। কপিকলটার সামনে দাঁড়াতেই কয়েকটা জয়েন্ট লক করে আমাকে একবার জিজ্ঞেস করলো, ‘রেডি?’ । আমি মাথা নাড়তেই প্যারাসুটটার প্রচন্ড টানে আমি উঠে গেলাম উপরে। প্রায় চল্লিশ থেকে পঞ্চাশ ফিট উপরে উঠে যাওয়ার পর আমার মনে হলো আমার পায়ের নিচে সারা পৃথিবীটা স্তব্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। অবাক হয়ে নিচে তাকিয়ে দেখতে লাগলাম নিশ্চুপ, শান্ত বিশাল নীলচে সবুজ রঙের সমুদ্রকে। অনেক দূরে একপাশে দেখা যাচ্ছে বিচের দিগন্ত রেখা। আর অন্য সব পাশেই শুধুই সমুদ্র। দূরে দূরে আরও কয়েকটা বোট থেকে আমার মতন আরও কয়েকজন আকাশে ভেসে আছে, তাদের ছায়া দেখতে পাচ্ছিলাম। টলটলে কাঁচের মতন পানি। সেখানে দেখা যাচ্ছে ছোট্ট বোটটাকে যার পাশে আমার প্যারাসুট আর আমার ছায়া পড়েছে বিশাল জায়গা জুড়ে। আমি সাবধানে পা নাড়িয়ে দেখলাম, বিশাল ছায়াটার বিশাল বিশাল পা দুটো নড়ছে। মনের মধ্যে এক অদ্ভূত আনন্দের অনুভূতি হলো। একবার মনে হলো চিৎকার করে সবাইকে জানিয়ে দেই মনের আনন্দটার কথা। কিন্তু কাকে বলবো? কে শুনবে? এই উচ্চতায় তো আমি একা। এই নিস্তব্ধ পৃথিবীটার দিকে যেন আমি একা তাকিয়ে আছি। কতক্ষন হবে- কয়েক সেকেন্ড? বড়জোড় এক মিনিট? কিন্তু আমার কাছে  মনে  হয়েছিলো যেন পৃথিবীটা থেমে গেছে কয়েক মুহুর্তের জন্য।

একটু পরেই টান অনুভব করলাম। আমাকে নিয়ে প্যারাসুট নিচে নামতে লাগলো। সোজা পানির উপরে। প্রচন্ড বেগে ছুটতে ছুটতে আমি পানি স্পর্শ করলাম। আস্তে আস্তে আমার শরীরের প্রায় অর্ধেক পানিতে ডুবে গেলো। সেই অবস্থায় স্পিড বোটের সাথে পাল্লা দিয়ে আমি প্রায় সমান তালে পানির মধ্যে দিয়ে ছুটতে লাগলাম। ব্যাপারটা যে কত মজার সেটা যে না করবে তাকে কোনদিনই বোঝানো সম্ভব না। আমাকে একবার পানির উপর তুলে কয়েক সেকেন্ড পর আবার ডুবানো হলো। আমি সেই অবস্থায় দাঁত বের করে হাসতে লাগলাম। নিশাত সবার প্যারাসেইলিংয়ের দৃশ্য ভিডিও করেছে। আমার সেই দাঁত বের করা হাসির দৃশ্যো ওর ক্যামেরায় বন্দি হয়ে রইলো। এরপর আমাকে সোজা উপরে উঠিয়ে আবার টেনে বোটে নিয়ে নামালো। আমি নামতেই লোকগুলো আমার বাঁধন খুলে দিলো। সব মিলিয়ে হয় তো আড়াই মিনিট হবে। আড়াই মিনিটের অভিজ্ঞতায় আমি ফুরফুরে আনন্দের অনুভূতি নিয়ে বসে পড়লাম অন্য সবার সাথে। আমার পর তুষার বাকি ছিলো। ওকে রাখলো সবচেয়ে বেশিক্ষণ। ওকে ডুবালো সব মিলিয়ে চারবার। একবার তো বলতে গেলে পুরাই ডুবিয়ে ফেললো!

সদ
রঙ্গিন প্যারাসুট নিয়ে পানিতে নাকানি চোবানি

আমাদের সবার হয়ে গেলে আমরা স্পিড বোটের জন্য অপেক্ষা করতে লাগলাম। ততক্ষণে অন্য যেই দলটা এসেছে তাদেরকে উঠানো হতে লাগলো। ওরাও আমাদের মত নরমাল টিকেট কেটেছে। প্রথম একজন কয়েক সেকেন্ড ভেসে থাকার পর ওদের একজন চ্যাঁচামেচি করতে লাগলো যে আমাদের বেশি সময় রাখা হয়েছে আর ওদের কমসময় রাখা হচ্ছে। স্টেয়ারিং হুইলে থাকা মোটা লোকটা তখন রেগে গেলো। সেই লোকটাও পালটা চিৎকার করে বলতে লাগলো যে আমরা ‘ডিপ সি’র টিকেট কেটে এনেছিলাম তাই আমাদের বেশি সময় রাখা হয়েছে। ওরাও তখন ডিপ সির জন্য বাড়তি টাকা দিতে চাইলো কিন্তু লোকটা তাদের সরাসরি না করে দিলো। সাফ জানিয়ে দিলো, টিকেট ছাড়া কাউকেই বাড়তি কিছু দেওয়া হবে না। ওরা কিছু বলতে না পেরে মুখ গোঁজ করে বসে রইলো। আর আমরা একজন আরেকজনের দিকে দৃষ্টি বিনিময় করে মিটিমিটি হাসতে লাগলাম। আমাদের সময় উনিই সবচেয়ে বেশি উৎসাহ দিয়েছিলেন, আর এখন উনিই কড়াভাবে না করে দিলেন!

স্পিড বোট আসলে আমরা উঠে পড়লাম। বোট আমাদের তীরে নিয়ে নামিয়ে দিলো। আমাদের অনেকে অন্যান্য রাইডের প্রতি আগ্রহ প্রকাশ করলো। জাফররা মনে হয় ব্যানানা রাইডে উঠার প্রিপারেশন নিলো। আমার আর কোন কিছুর প্রতি আকর্ষণ ছিলো না। আমরা কয়েকজন হেঁটে হেঁটে কালাঙ্গুটের দিকে যেতে লাগলাম। আমি আর রিন্তু পাশাপাশি হাঁটছিলাম। ফস করে কে যেন পাশ থেকে বলে উঠলো, ‘আয়সি কাপড়ে পেহেনকার ইয়াহা কোয়ি আতাহে?’। আমি শুনি নাই, কিন্তু রিন্তু শুনে ফেললো। এই বিচের মধ্যে হিজাব পরা লোকজন হয়তো খুব একটা দেখা যায় না, তাই আমাদের দেখে মন্তব্যকারীর মত অনেকেই হয়তো বেশ অবাক হয়েছে। আমি আর রিন্তু একজন অন্যজনের দিকে তাকিয়ে হাসলাম।

আজকেই আমাদের গোয়ায় শেষদিন। বিকালেই গোয়া ছেড়ে চলে যাবো। তাই শেষবারের মত কালাঙ্গুটে বিচে এসে পানির উপর বসলাম আমি আর তমা। মিম, অন্তরা আর রিন্তু হোটেলে ফিরে গেলো। ওদের গোসল করে বের হতে সময় লাগবে। তাই এই মুহুর্তে আমার হোটেলে ফিরে গিয়ে লাভ নাই। রুবাইদা, আমি আর তমা বেশ আয়েশ করেই পানিতে বসলাম। তারপর আমি আর তমা গল্প করতে লাগলাম। লোনা পানির ঢেউয়ের ঝাপ্টায় আমাদের গল্পে মাঝে মাঝে ছেদ পড়তে লাগলো। আমরা তাল সামলে আবার ঠিক হয়ে বসে গল্প করতে লাগলাম। প্যারাসেইলিং করবো বলে মোবাইল কিংবা ঘড়ি কোনটাই নিয়ে বের হই নাই। তাই কেউ ফোন করারও নাই, বা ঘড়িতে সময় দেখারও উপায় নাই। দুপুরের গনগনে সূর্যের তাপকে আমরা পাত্তাই দিলাম না। বিশাল সমুদ্রের তীরে বসে সব চিন্তা বাদ দিয়ে লোনা পানির ঢেউয়ে বসে বসে নিশ্চিন্ত মনে গল্প করতে লাগলাম আমরা। যখন মনে হলো অনেক সময় পার হয়ে গেছে, তখন আমরা তিনজন উঠে পড়লাম। শেষবারের মত বিদায় জানালাম ভুমধ্যসাগরকে। বিচ ছেড়ে হাঁটতে শুরু করলাম হোটেলের দিকে।

রুমে পৌঁছে দেখি ওদের গোসল প্রায় শেষ। আমি ঢুকে পড়লাম গোসল করার জন্য। ততক্ষণে বাথরুমে বালির এক বিশাল পাহাড় তৈরি হয়েছে। যতই পানিঢালা হোক না কেন সেই বালি কিছুতেই সরে না। আমার গোসল শেষে জামাকাপড় ধোয়ার পর সেই পাহাড় আরও বড় হয়ে গেলো। গোসল শেষে বের হয়ে দেখি রিন্তু চলে গেছে। ওদের সাথে ক্যাফে মোকায় যাওয়ার কথা ছিলো। কিন্তু কি আর করা, আমার দেরি হয়ে গেছে। আমি তাড়াতাড়ি তমাদের বাড়ির দিকে হাঁটা ধরলাম। তমা, রিজভী আর আফরা বের হয়ে আসলো। ওরাও ক্যাফে মোকাতেই যাবে। আমি ওদের সাথে জুটে গেলাম। কিন্তু কমিটির লোকজন বার বার বলতে লাগলো ঠিক ঠিক চারটার সময় আমরা রওয়ানা দিয়ে দিবো। যে করেই হোক তার আগেই এসে বসে থাকতে হবে। আমরা বের হয়ে অটো ঠিক করতে গেলাম। কিন্তু অটোওয়ালা রাজি হলো না। আমরাও সময় হিসাব করে দেখলাম গিয়ে ফেরত আসা সম্ভব হবে না। তাই কি আর করা, মোকাতে না যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়ে নিলাম আমরা। দুপুরে খাওয়ার জন্য ঢুকলাম ‘বৃন্দাবন হোটেল’ এ।

বেশ বড় খোলামেলা হোটেল। আমরা বসার সাথেসাথেই মেনু নিয়ে আসলো একজন লোক। আমি অর্ডার দিলাম প্রন হাক্কা নুডুলস আর ব্যানানা শেক। কিছুক্ষনের মধ্যেই বড় বড় চিংড়ি দেওয়া মজাদার নুডুলস এসে হাজির হলো। আমরা সবাই গোগ্রাসে খাওয়া শুরু করলাম। সবার খাওয়ার পরিমান এত বেশি ছিলো যে খেয়ে কিছুতেই শেষ করা গেলো না। খাওয়াদাওয়া শেষ করে আমি আর তমা বের হয়ে পড়লাম বাদাম কেনার জন্য। তমা বাদাম কিনতে চায়, কিন্তু কয়েকটা দোকানে বাদামের অস্বাভাবিক দাম দেখে ও না কেনার সিদ্ধান্ত নিলো। একটা আইসক্রিমওয়ালার কাছ থেকে ‘ভাদিলালাল’ এর একটা চকোবার কিনলো তমা। আমি খেয়াল করলাম লোকটা নিজেই আইস্ক্রিমের প্যাকেটটা ছিড়ে আইসক্রিম বের করে তমার হাতে দিলো। পরে তমা খেতে খেতে বললো আইস্ক্রিমটা একটু অন্যরকম। আমি বললাম- এটা দুই নম্বুরি ভাদিলাল। কারণ আমাদের প্যাকেট দেখতে দেয় নাই। ব্যাটা নিজেই ফেলে দিয়েছে। তমাও মনে হয় ব্যাপারটা বুঝতে পারলো। দুঃখি দুঃখি মনে তমা আইসক্রিম খেতে লাগলো।

হোটেলে ফেরার পথেই রুবাইদার সাথে দেখা। ও ১০০-১৫০ রুপি দিয়ে স্কার্ফ কিনেছে। আমাকে দেখানোর জন্য ঐ দোকানে নিয়ে গেলো ও। আমার তেমন পছন্দ হলো না। আমরা সেই দোকান থেকে বের হয়ে হোটেলের দিকে যেতে লাগলাম। হোটেলের সামনে গিয়ে দেখি সারি সারি বড় বড় মাইক্রো দাঁড়ানো। এইগুলোতে করে আমরা রেলস্টেশন যাবো। সেগুলোতে আমাদের লোকজন উঠে মালপত্র টানাটানি করে ঢুকাচ্ছে। কি সর্বনাশ, সবাই গাড়িতে উঠে গেছে! আমি আর রুবাইদা দৌড় দিলাম। দৌড়াতে দৌড়াতে সিড়ি দিয়ে দোতলায় উঠে বারান্দায় শুকাতে দেওয়া কাপড়গুলো একটানে নিয়ে লাগেজে ভরে লাগেজ টানতে টানতে নেমে পড়লাম। আবার সেই সিড়ি দিয়ে লাগেজ নামিয়ে কাঁচা রাস্তার উপর দিয়ে টেনে টেনে মাইক্রোর সামনে এসে দাঁড়ালাম। এদিক সেদিক তাকিয়ে দেখি সব গাড়িই ভর্তি। কোনটাই খালি নাই। আমি রুবাইদা আর তুষার আমরা তিনজন লাগেজ নিয়ে দাঁড়িয়ে আছি রাস্তায়। কোন গাড়িতে উঠতে পারছি না। শুনলাম আরও একটা গাড়ি নাকি আসবে। সেটাতে আমরা উঠবো।

ওই দিকে জুবায়ের একটা গাড়ির সামনে বসে জানালো তুষারকে কোনমতে উঠে পড়ার জন্য সেই গাড়িতে। কিন্তু ভিতর থেকে সবাই বলতে লাগলো আমাকে উঠে পড়তে। জুবায়ে বললো, ‘লাগেজের জায়গা হবে না কিন্তু’।  রুবাইদা আর তুষার আমাকে বললো লাগেজ ছাড়াই উঠে পড়তে। আমি কোন মতে উঠে পড়লাম। ভেতরে এক অদ্ভূত দৃশ্য! পুরো গাড়িটা মানুষ আর লাগেজে এমনভাবে পরিপূর্ণ যে কোন নড়াচড়ার জায়গা নেই। ভেতরে ঢুকতেও আমাকে বেশ বেগ পেতে হলো। সৌভাগ্যক্রমে আমি অন্তরার পাশে এক চিলতে বসার জায়গা পেয়ে গেলাম। আমি বসার পর মনে হলো, আমার লাগেজটাও মনে হয় কোনমতে এটে যাবে। আমি সেকথা বলতেই বাইরে থেকে তুষার আমার লাগেজটা ঠেলে ভিতরে ঢুকিয়ে দিলো। কিন্তু ভারি লাগেজটা আমি ধরে রাখতে পারছিলাম না। হাত থেকে ফস্কে যাচ্ছিলো। এগিয়ে এলো রিন্তু, ফাহাদ, ইশতিয়াক আর শুভ। সবাই মিলে হ্যাঁচকা টান দিয়ে হাতবদল করতে করতে লাগেজটাকে একদম পিছে পাঠিয়ে দিলো। এক চিলতে জায়গায় কোলের উপর ব্যাকপ্যাকটাকে নিয়েই বসলাম। অ্যাট লিস্ট গাড়িতে উঠার জায়গা পেয়েছি, এটাই বা কম কিসে?

বাইরে থেকে আমাদের হোটেলের একজন লোক উসখুস করতে লাগলো, কেন আমরা রওয়ানা দিচ্ছি না। উনিই বললো আরেকটা গাড়ি এসে যাবে, এখন যেই গাড়িগুলো আছে সেইগুলো রওয়ানা দিয়ে দেওয়া দরকার। যেতে নাকি অনেক সময় লাগবে। ওনার তাড়াহুড়া দেখে কমিটি নির্দেশ দিলো রওয়ানা দেওয়ার। একটা একটা করে গাড়ি চলতে শুরু করলো। আমরা দেখলাম, সৌরভ, তুষার আর রুবাইদা বেশ কিছু মালপত্র নিয়ে রাস্তায় দাঁড়িয়ে আছে। ওরা অপেক্ষা করতে লাগলো ওদের গাড়ির জন্য। আর ওদের ফেলেই আমরা রওয়ানা দিলাম।

আমাদের ড্রাইভার জিজ্ঞেস করলো আমাদের ট্রেন কয়টায়। সাড়ে ছয়টায় ট্রেন শুনে ড্রাইভার অবাক হয়ে হিন্দিতে বললো, ‘এত দেরিতে কেন রওয়ানা দিয়েছেন? আপনারা তো পৌঁছাতে পারবেন না’। হোটেলের লোক আমাদেরকে স্টেশন এক দেড় ঘন্টার পথ বলেছে- এই কথা শুনে সে বললো, ‘সে তো অন্যসব দিনের জন্য, কিন্তু আজকে তো ভ্যালেন্টাইন ডে- আজকের জন্য তো আলাদা হিসাব’। এই বলে ড্রাইভার বেশ তাড়াহুড়া করে চালাতে লাগলো। জুবায়ের বারবার ওনাকে আস্তে ধীরে চালাতে বললো। কিন্তু ঊনার মুখে একটাই কথা, ‘আপনারা তো পৌঁছাতে পারবেন না’। বারবার একই কথা বলা আমরা একটু ভয় পেয়ে গেলাম।

মোটামুটি ফাঁকা রাস্তা দিয়েই আমাদের গাড়ি চলতে লাগলো। একটা হাইওয়েতে উঠে টের পেলাম ‘ভ্যালেন্টিন ডে’র মাহাত্ম। পুরো হাইওয়ে জ্যাম। বিশাল হাইওয়ে জুড়ে হাজার হাজার গাড়ি থমকে বসে আছে। কেউ নড়াচড়া  করছে না। শুনলাম সামনে নাকি কি এক কার্নিভাল আছে ভ্যালেন্টাইন ডে উপলক্ষে- সেই জন্য এত জ্যাম। বেশ খানিক্ষণ জ্যামে বসে থেকে আমরা ছটফট করতে লাগলাম। ঘড়ির কাঁটা এগিয়ে যেতে লাগলো, কিন্তু আমরা থেমেই রইলাম। গাড়ির পিছনে ততক্ষণে নানা আলোচনা শুরু হয়ে গেছে। শুভ বলছে যে ট্রেন যখন মিস করবোই তখন আর সামনে গিয়ে লাভ কি, ব্যাক করে গোয়াতে ফিরে গেলেই হয়। আবার রিন্তু বলতে লাগলো, ট্রেন পাই আর না পাই, স্টেশন পর্যন্ত যেতে তো আর অসুবিধা নাই। ইশতিয়াক বলতে লাগলো, অত রাত করে স্টেশনে পৌঁছে ব্যাক করার সুযোগ পাবো না, তারচেয়ে সময় থাকতে থাকতে ব্যাক করে ফেলা ভালো। শুভ ওইদিকে বসে বসে ‘প্ল্যান বি’ চিন্তা করতে লাগলো। ট্যুর প্ল্যান থেকে সাউথের পার্টটা বাদ দিয়ে কাশ্মির কিংবা দার্জিলিং অ্যাড করলে কেমন হয় সেই নিয়ে জোর আলোচনা হতে লাগলো। সব শুনে আমাদের মনে হতে থাকে, আজকের দিনে দারুণ একটা ঘটনা ঘটবে। ট্যুর প্ল্যানটা বোধহয় এইবার লন্ডভন্ড হয়ে গেলো!

ওদের প্ল্যান বি মোটামুটি ফাইনাল হয়ে গেলো, রিন্তু আর ফাহাদ একটু পর পর ম্যাঁও ম্যাঁও ডাকতে লাগলো, জুবায়ের গাড়ি থেকে নেমে আশেপাশে ঘুরে বেড়াতে লাগলো- কিন্তু আমরা আর জ্যাম ছেড়ে বের হতে পারলাম না। মাঝে মাঝে একটু আধটু নড়াচড়া হয়, কিন্তু জ্যাম থেকে আর বের হতে পারি না। এরমধ্যেই মোটামুটি ৬টা বেজে গেলো। আমরা যখন শিওর যে পৌঁছানো সম্ভব নয়, তখন জুবায়ের জানালো ট্রেন ডিলে করেছে এক ঘন্টা। আমরা খুশি হয়ে গেলাম, কিন্তু ড্রাইভার আগের মতই বলতে লাগলো, ‘লাভ নাই, ট্রেন মিস করবেন’। এক সময় আমাদের কথার সব স্টক শেষ হয়ে গেলো। আমরা ক্লান্ত হয়ে চুপ হয়ে গেলাম। সূর্য ডুবে গেলো। আমাদের মাইক্রো একটু একটু করে এগিয়ে যেতে লাগলো। রাত হয়ে গেলে আমাদের গাড়ি একটু ফাঁকা রাস্তা পেয়ে গেলো। ড্রাইভার প্রাণপণে গাড়ি চালাতে লাগলো।

আমরা যখন মারগাও স্টেশনে পৌঁছাই তখন আরও দুইটা গাড়ি এসে পড়েছে। আমরা তিন গাড়ির লোকজন দ্রুত গতিতে মালপত্র নামাতে লাগলাম। লাগেজটা হাতে নিয়ে দৌড়াতে দৌড়াতে স্টেশনে ঢুকে পড়লাম আমরা। হাঁপাতে হাঁপাতে যখন ওয়েটিং রুমে পৌঁছালাম তখন বাজে রাত পৌঁনে আটটা। সেখানে ঢুকে খবর পেলাম ট্রেন আরও এক দফা ডিলে হয়ে আসার টাইম হয়েছে রাত পৌনে দশটা। আমরা বুকের ভিতর আটকে থাকা নিশ্বাস ছাড়লাম। যাক বাবা, বাঁচা গেলো! আগের মত আমরা আমাদের মালপত্র বাঁধাছাঁদা করে বিশাল স্তুপ করে রাখলাম। আমার মোবাইলে রিচার্জ করা দরকার। আমি আর চিং খুঁজতে বের হলাম রিচার্জ করার দোকান।

অদ্ভূত ব্যাপার হলো রিচার্জ খুঁজতে খুঁজতে আমরা একটা ওভারব্রিজ পার হয়ে স্টেশন থেকে বের হয়ে পড়লাম। তাও কোন দোকান খুঁজে পেলাম না। এত্ত বড় স্টেশনে কোন মোবাইল রিচার্জের দোকান নাই, কি আজব! খুঁজতে খুঁজতে এক সময় যখন বুঝলাম কোন লাভ নাই, তখন আমি আর চিং ব্যাক করলাম। আমাদের দুজনের পায়েই স্পঞ্জের স্যান্ডেল- সেটা নিয়ে আমরা বেশ হাসাহাসি করলাম। স্টেশনের ভিতরে একটা দোকান থেকে আমি পানি আর বিশাল একটা স্যান্ডউইচ কিনে নিলাম। আপাতত এটাই আমার রাতের খাবার। এইসব নিয়ে আবার ওয়েটিং রুমে ফেরত গেলাম। সেখানে বসে খাওয়াদাওয়া করে নিলাম। তারপর গেলাম ‘সুলভ শৌচালয়’ এ। একেবারে দাঁতটাত মেজে ফ্রেশ হয়ে বের হলাম।

আগেরবারের মত এবার আর আমরা ভুল করলাম না। সাড়ে নয়টা বাজতেই আমরা ব্যাগপত্র নিয়ে প্ল্যাটফর্মে গিয়ে দাঁড়ালাম। আমি, উর্মি, চিং আর নিলয় ছাড়া বাকি ৪২ জনের সিট পড়েছে এক বগিতে। আমরা চারজন শুধু আলাদা বগিতে। ওরা ৪২ জন ওদের বগির নম্বর লিখা প্ল্যাটফর্মে গিয়ে দাঁড়ালো। ট্রেন নাকি থামবে কয়েক মিনিটের জন্য। এরমধ্যে সব মালপত্র নিয়ে এতজন মানুষের ট্রেনে ওঠা একটা বিশাল চ্যালেঞ্জ। তাই ওরা বুদ্ধি করে ২১ জনের দুইটা দলে ভাগ হয়ে গেলো। একদল ঢুকবে ডান পাশের দরজা দিয়ে, আরেকদল ঢুকবে বামপাশের দরজা দিয়ে। নিজেদের মধ্যে অনেক প্ল্যান প্রোগ্রামও হয়ে যাচ্ছিলো যে কিভাবে কে আগে উঠবে আর কিভাবে মালপত্র আর অন্যরা উঠবে। আর এদিকে আমরা চারজন খানিক দূরে প্ল্যাটফর্ম ১৮তে দাঁড়িয়ে আছি। আমরা খুব বেশি মানুষজন না, তাই আমাদের চিন্তাও কম। আমরা অধীর আগ্রহে ট্রেনের জন্য দাঁড়িয়ে রইলাম। উল্টাপাশের প্ল্যাটফর্মে একটা ট্রেন এসে থামলো। আমরা বাকিদের দিকে তাকাতে লাগলাম, ঐটা আমাদের ট্রেন নয়তো? দূর থেকে ওরাও ইশারা দিলো, না-ঐটা না। আমরা আবার অপেক্ষা করতে লাগলাম। এরমধ্যে একটা অদ্ভূত ট্রেন দেখলাম। এটা মালগাড়ি। তবে কন্টেনারের বদলে ট্রাক টানছে। মাল বোঝাই ট্রাকগুলোর ভিতরে ড্রাইভার আর হেল্পার বসে আছে। ট্রেনের ইঞ্জিন দিয়ে ট্রাক টেনে নেওয়ার ঘটনাটা আমি কখনও দেখি নাই। আমরা অবাক হয়ে দেখতে লাগলাম।

পৌনে দশটা বেজে পার হয়ে গেলো অথচ ট্রেন আসছে না দেখে আমরা চিন্তায় পড়ে গেলাম- কোন ভুল করলাম না তো?। এদিকে পুরো প্ল্যাট ফর্মে আমরা ছাড়া তেমন আর কোন মানুষজন নাই। এর মধ্যে কতগুলো কুকুর ঘাউঘাউ করতে লাগলো। একজন লম্বা মতন লোক কুকুরগুলোর থেকে দূরে সরে আমাদের কাছে এসে দাঁড়ালো। উনি উর্মিকে জিজ্ঞেস করতে লাগলো যে আমরা কই যাবো, কোথা থেকে এসেছে- এইসব। অন্য সবার মত আমাদের বিশদ কাহিনী শুনে লোকটাও বেশ অবাক হলো। লোকটা আমাদের নিশ্চিত করলো যে আমাদের ট্রেন এই জায়গাতেই আসবে। লোকটা নিজেকে একজন ইন্ডিয়ান আর্মি অফিসার হিসেবে পরিচয় দিলো। উনার কথাশুনে আমরা কিছুটা ভরসা পেলাম যে, ট্রেন আমাদের মিস হয় নাই!

অবশেষে রাত সাড়ে ১০টার দিকে ট্রেন আসলো। আমরা স্নায়ু টানটান করে দাঁড়িয়ে রইলাম। যেই ট্রেনটা থামলো সবার আগে আমি উঠে গেলাম দরজা দিয়ে। নিলয় নিচ থেকে টপাটপ আমাদের লাগেজগুলো তুলে দিতে লাগলো। আমরা সেগুলো টেনেটেনে ভিতরে ঢুকাতে লাগলাম। আমাদের তিনটা বড় লাগেজ ওঠানো হয়ে গেলে নিলয় উঠে পড়লো। সব মিলিয়ে মাত্র দশ থেকে পনের সেকেন্ড সময় লাগলো। আমরা একজন আরেকজনের দিকে তাকিয়ে হেসে ফেললাম। নিজেরদের কর্মে নিজেরাই মুগ্ধ হয়ে গেলাম। তারপর মালপত্র ঠেলে বগির ভিতরে ঢুকলাম। আমাদের সিট নম্বরগুলো পেয়ে গেলাম সহজেই। আমাদের খোপে একপাশে সবার উপরে নিলয়, তারপরেরটায় উর্মি আর সবচেয়ে নিচেরটায় আমি। আমার ঠিক উল্টো পাশে চিং। আমাদের বিশাল বিশাল লাগেজ ঢোকাতেই দুই সিটের মাঝখানের জায়গাটা ভরে গেলো। আগে তাও সিটের তলায় লাগেজ ঢুকেছিলো। এখন সব ফুলে ফেঁপে বড় হয়ে যাওয়ায় আমারটা ছাড়া আর কারওটা সিটের নিচে গেলো না। আমার লাগেজ আর সবার ব্যাকপ্যাকগুলো ঢুকানো হলো সিটের নিচে। নিলয়ের হ্যাভারস্যাক, উর্মি আর চিঙয়ের লাগেজটা রাখা হলো লাইন ধরে দুইসিটের মাঝখানে। আমাদের সব কিছু গোছগাছ করতে করতে ট্রেন ছেড়ে দিলো। একটু গুছিয়ে নিয়ে আমরা ফোন দিয়ে অন্যদের খবর নিলাম। ওরাও অন্য বগি থেকে আমাদের খবর নিলো আমরা ঠিক মত উঠেছি কিনা!

আমি একবার অন্য বগিতে সবার সাথে দেখা করে আসতে চাইলাম। কিন্তু কিছুদূর গিয়ে টের পাই মাঝে এক বগির দরজা সিল করে দেওয়া। তাই অন্যদের সাথে দেখা না করেই ফিরে আসি। এদিকে চিঙয়ের উপরের সিটটা একজন চমৎকার আংকেলের। উনি ব্যাগ গোছগাছ করতে আমাদের সাহায্য করলেন। ভদ্রলোক সাউথ ইন্ডিয়ান। হিন্দি বোঝেন না। অল্পবিস্তর ইংরেজি জানেন। তাই দিয়ে আমাদের সাথে কথা বলতে লাগলেন। আমাদের কাহিনী শুনে বেশ মজা পেলেন। চিং ওনাকে ইশারায় বললো যে ও রাতের খাবার খেয়েই মাঝের বাংকারটা মেলে দিবে। উনিও হাসিমুখে সায় দিলেন। কিন্তু কয়েক মিনিট পর ঘুমের চোটে ঝিমাতে লাগলেন। চিং তাড়াতাড়ি খেয়ে ওনার বাঙ্কারটা মেলে দিতেই উনি ঘুমিয়ে পড়লেন। আমি, নিলয় আর উর্মি কিছুক্ষণ কথা বার্তা বলে যার যার জায়গায় শুয়ে পড়লাম। শুয়ে পড়তেই ঘুম চলে আসলো। টের পেলাম প্রচন্ড গতিতে আমাদের নিয়ে ছুটে চলছে এই ট্রেন।

The Mighty INDIA CALLING: গোয়ার পথে ঘাটে সারাদিন ঘোরাঘুরি (পর্ব ২৯)

সকালে ঘুম ভাংলো একটু হৈ চৈয়ে। মজুমদারের ফোনটা খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না। ও সারা রুম তন্ন তন্ন করে খুঁজতে লাগলো। আমাদের সবাইকে জিজ্ঞেস তো করলোই, নিচে গিয়েও সবাইকে বলতে লাগলো ওর ফোনের কথা। ওর ফোনে আমাদের ট্যুরের গাদাখানেক ছবি আছে। ফোন হারিয়ে গেলে তো বেশ চিন্তার বিষয়। যাই হোক হাত মুখ ধুয়ে স্পঞ্জের স্যান্ডেলটা পায়ে গলিয়ে আমরা ফ্রেশ হয়ে নিচে নামলাম। সবাই একবার বিচে যাওয়ার প্ল্যান করলাম। সকালবেলার হাল্কা রোদে নিরিবিলি বিচে দাঁড়িয়ে আমরা সমুদ্র দেখতে লাগলাম। খুব ভালো লাগছিলো আমাদের। কিন্তু নাশতা করা হয় নাই। তাই আমরা বেশিক্ষণ থাকলাম না। আবার হোটেলের দিকে রওয়ানা দিলাম।

এদফ
সকালবেলা শান্ত সমুদ্রের পাশে (কৃতজ্ঞতায় রেহনুমা তাবাসসুম অন্তরা)

নাশতা খেতে ঢুকলাম ভিন্সি’স প্লেসে। নাশ্তার মেনু দেখে অর্ডার দিলাম ব্রেড উইথ ফ্রায়েড এগ। আমার পাশে সুমাইয়া দিলো ব্রেড উইথ অমলেট। তারপর অর্ডার আসলে আমি খেলাম সুমাইয়ারটা আর সুমাইয়া খেলো আমারটা। বড় বড় টোস্ট করা পাউরুটির সাথে সুন্দর করে ভাজা ডিম। খেতে ভালোই ছিলো। ওদিকে অন্তরার ফিশ অ্যান্ড চিপসও টেস্ট করে দেখলাম। আমরা খেতে খেতে গল্প করছিলাম। খাওয়া শেষে ৪০ রুপি বিল মিটিয়ে দিয়ে বের হয়ে গেলাম ভিন্সি’স প্লেস থেকে।

এবার আমরা হাঁটতে লাগলাম রাস্তা ধরে। একম একটা রাস্তা যে রাস্তায় আগে যাই নাই। ধীরে সুস্থে আমরা দেখতে দেখতে হাঁটতে লাগলাম। গোয়ার ঘরবাড়ি, রাস্তাঘাট, মানুষজন- সব কিছু একটু আলাদা। রাস্তা দিয়ে প্রচুর মটর সাইকেল যাচ্ছে। টুরিস্টদের জন্য ২০০-৩০০ রুপি দিয়ে সারাদিনের জন্য একটা মটর সাইকেল ভাড়া পাওয়া যায়। খ্রিস্টান সংখ্যাগরিষ্ঠ গোয়া দেখতে একেবারে সেই রকম ঠিক সিনেমাতে যেমনটা দেখা যায়!  আমাদের সামনে অনেকগুলো দোকানপাট চোখে পড়লো। নানা রকম জুয়েলারি সাজিয়ে রেখেছে দোকানে দোকানে। আমর এদিক ওদিক ঢুঁ মারতে লাগলাম। এক দোকানে ঢুকে সবাই নানা রকম জুয়েলারি পছন্দ করতে লাগলো। সবগুলো দোকানেই দাম একটু বেশি মনে হচ্ছিলো। কিন্তু সেই দোকানে আমাদের সব কিছুরই দাম কমিয়ে দিবে বললো। আমরাও উৎসাহ পেয়ে জিনিসপত্র দেখতে লাগলাম। আমরা সবাই মিলে বেশ কিছু জিনিস কিনলাম। দোকানদার আমাদের সবাইকে একটা করে ছোট আয়না উপহার দিলো। দোকান থেকে বের হতেই রুবাইদার সাথে দেখা হলো। রুবাইদা একটা তালপাতার মেক্সিকান হ্যাট কিনেছে। বিশাল মেক্সিকান হ্যাটটা দেখতে খুবই সুন্দর।

আমরা হাঁটতে হাঁটতেই ঠিক করলাম যে আমাদের কালাঙ্গুটে বিচ থেকে দূরে বাগা বিচের দিকে যাবো। তবে ঠিক বিচ ধরে নয়, রাস্তা ধরে শহর দেখতে দেখতে। বেলা গড়িয়ে দুপুর হয়ে যাচ্ছে দেখে নিশাতই অফার দিলো গতরাতের ভিক্টোরিয়াতে ঢুঁ মারার জন্য। আমরা হেঁটে হেঁটে ভিক্টোরিয়াতে ঢুকে পড়লাম। অনেক দেখেটেখে অর্ডার দিলাম প্রন নুডুলস। অনেক প্রন দেওয়া গরম গরম নুডুলস আসলো। আমরা খুব মজা করে খেলাম। ১২০ রুপি বিল দিয়ে বের হয়ে আসলাম আমরা। এরপর ডক্টর আলফন্সো রোড ধরে সোজা হাঁটতে লাগলাম আমরা। গোয়ায় ট্যাটু করানোর দোকান আছে প্রচুর। এই দোকানগুলোর বাইরে বড় বড়সব কিলবিলে ট্যাটুর ছবি। আর আছে বাদামের দোকান। শুধুই বাদাম যার বেশির ভাগই কাজু। তবে দাম বেশি। এর চেয়ে অনেক কম দামে আমি মানালি থেকে বাদাম কিনেছি। এই সব দেখতে দেখতেই একটা মোড়ে এসে অনেকগুলো বড় বড় দোকানপাট পেলাম। ব্যাঙ্ক এবং মানি এক্সচেঞ্জের দোকান দেখে নিশাত আর পৃথ্বীর ডলার ভাঙ্গানোর কথা মনে পড়লো। তাই আমরা এদিক সেদিক ঘোরাঘুরি করে সবচেয়ে ভালো ডলারের রেট আছে এমন মানি এক্সচেঞ্জ খুঁজতে লাগলাম। এরমধ্যে আমাদের সাথে দেখা হলো ফাহাদ আর তানভীরের। ওরা জুম্মার নামাজ পড়ে এসেছে। ওদের দেখে আমরা বুঝলাম আজকে শুক্রবার!

ওরাও আমাদের সাথে যোগ দিলো। সবাই মিলে একটা কাজুবাদামের দোকানে গিয়ে ডলার ভাঙ্গিয়ে নিলো। ডলার ভাঙ্গানো শেষ হলে আমরা সবাই একসাথে রওয়ানা দিলাম বাগা বিচের দিকে। ক্যাফে মোকার অনেক নাম শুনেছিলাম আমরা। একবার ভাবলাম সেখানে আগে ঘুরে আসি। একটা অটোওয়ালাকে জিজ্ঞেস করতেই ভাড়া চাইলো ৩০০ রুপি। শুনেই আমরা সেই যাত্রায় মোকা যাবার প্ল্যান বাদ দিয়ে কালাংগুটে- বাগা রোড ধরে হাঁটতে লাগলাম। বেশ কিছুদূর হাঁটার পর ফাহাদ একটা দোকান দেখিয়ে বললো গতরাতে ও এখানে গিয়েছিলো। দোকানটার নাম চকোলেট রুম। আমরাও ঢুকে পড়লাম ভিতরে। দারুন সুন্দর সুন্দর সব ডেজার্ট আইটেম সাজানো সেখানে। কোনটা ছেড়ে কোনটা অর্ডার দিবো বুঝতে পারছিলাম না। শেষে ৮০ রুপির একটা চকোলেট স্মুদি অর্ডার দিলাম। স্মুদিটা এত্ত মজা, আর বলার মত না! নিচের চকোলেটটা এতই মোটা যে খেয়েই শেষ করতে পারলাম না।

খেয়েদেয়ে আবার বের হয়ে এলাম। আবার হাঁটা শুরু করলাম। পথটা খুব ছোট নয়, তার উপর আমরা ধীরে সুস্থে গল্পগুজব করতে করতে হাঁটছিলাম। তাই সময় লাগছিলো অনেক বেশি। পথের দুপাশের দোকানগুলোর জিনিস অনেক সুন্দর। ধাতব জুয়েলারি, মুক্তার নেকলেস, পাথরেরর সেটগুলো অনেক সুন্দর সুন্দর। কিন্তু দামগুলো আকাশ্চুম্বী। আমরা খালি দেখেই যাচ্ছিলাম। কেনার উদ্দেশ্য কারও ছিলো না। এই সব দামী দামী দোকান শেষ হয়ে একসময় যখন সুভেনিয়র শপ, লিকার শপ আর নাইট ক্লাব দেখা যেতে লাগলো তখনই আমরা টের পেলাম যে বিচের কাছাকাছি চলে এসেছি। সত্যি সত্যি একটু পরই বিচ চলে আসলো। গনগনে রোদে দাঁড়িয়ে আমরা সমুদ্রের দেখা পেলাম। আমরা একটু ছায়ায় দাঁড়ালাম আর ফাহাদ আর তানভীর গেলো প্যারাসেইলিং দরদাম করতে। ওরা এসে জানালো ৮০০ রুপি লাগবে, মানুষ যত বেশিই হোক- দাম বাড়বে বা কমবে না।

এই বিচের মধ্যে দাঁড়িয়ে না থেকে আমরা ঢুকে পড়লাম একটা শ্যাকে যার নাম ‘ফ্রেশ বিচ সাইড শ্যাক’। সবাই মিলে অর্ডার দিলাম পাস্তা, রেড স্ন্যাপার ফ্রাই আর স্লাইস। অর্ডার আসতে আসতে আমি টুরিস্টদের দিকে তাকিয়ে দেখতে লাগলাম। ভারতীয় পর্যটক ছাড়াও গোয়ায় প্রচুর বিদেশি পর্যটক আসে। এদের বড় অংশ সম্ভবত রাশিয়ান কারণ অনেক দোকানের সাইনবোর্ডে রাশিয়ান ভাষায় লিখা দেখেছি। আর বেশির ভাগ পর্যটকই বয়সে তরুন। মধ্য বয়স্ক বা একটু বয়স্ক লোকের সংখ্যা কম। পরিবার নিয়ে আসা লোক মনে হলো খুবই কম। সবাই মোটামুটি বন্ধুবান্ধবের দল নিয়েই বেশি এসেছে। এসব দেখে মনে হলো গোয়া প্রধানত ‘ফুর্তি’ করার জায়গা। বিকালের তীব্র রোদে আমরা মজাদার মাছ ভাজা খেতে খেতে হাসি আড্ডায় মেতে উঠলাম। ফাহাদ একের পর এক কথাবার্তা বলে যেতেই লাগলো আর আমরা হা হা করে হাসতে লাগলাম।

সেফ
বাগা বিচের ছোটখাটো শ্যাক (কৃতজ্ঞতায় রফিকুল ইসলাম তুষার)

খাওয়া দাওয়া শেষ করে সূর্যের তেজ কমলে আমরা বের হয়ে গেলাম। সমুদ্রের পানিতে পায়ের পাতা ডুবিয়ে হাঁটতে লাগলাম। এগিয়ে যেতে লাগলাম আমাদের কালাঙ্গুটে বিচের দিকে। রাস্তাটা নেহায়েত কম নয়। তাই আমরা হাঁটতে হাঁটতেই সূর্যটার ডোবার সময় হয়ে এলো। দিনের আলোতে সব কিছু দেখে চিনতে পারি। কিন্তু অন্ধকারে আমাদের হোটেলের সামনের বিচটা কেমন করে চিনতে পারবো সেটা নিয়ে চিন্তা করে আমরা পা চালিয়ে হাঁটতে লাগলাম। কিন্তু লাভ হলো না। একটু পরেই সূর্য ডুবে গেলো। আমরা জোরে জোরে হাঁটতে লাগলাম। হাঁটতে হাঁটতে অবাক হয়ে দেখলাম সূর্য ডোবার সাথে সাথেই সবগুলো শ্যাক থেকে চেয়ার টেবিল ধরে ধরে বাইরে খোলা আকাশের নিচে নিয়ে আসা হলো। প্রত্যেকটা টেবিলে একটা করে মোমবাতি জ্বালিয়ে দেওয়া হলো। আর শ্যাকগুলোতে রংচঙ্গে বাতি জ্বলে উঠলো। দূর থেকে দেখতে ভারী সুন্দর লাগছিলো। এই দেখতে দেখতে আমরা এক সময় আমাদের হোটেলের কাছাকাছি বিচে চলে আসলাম বলে মনে হলো। সত্যি সত্যি ভালোমত খোঁজাখুঁজি করে পেয়ে গেলাম আমাদের গলিটা।

অন্ধকার হয়ে গেলেও হোটেলে ফিরে যেতে মন চাচ্ছিলো না। আমি আর সুমাইয়া একটা বিচ চেয়ারে বসে গান শুনতে লাগলাম। সুমাইয়ার মোবাইলে চলতে লাগলো, ‘মোর ভাবনারে কে হাওয়ায় মাতালো-’ । আধো অন্ধকার রাতে সমুদ্রের গর্জনের সাথে স্নিগ্ধ লোনা বাতাসে আমাদের প্রাণ জুড়িয়ে গেলো। আমরা ঠান্ডা বালিতে পা ডুবিয়ে অনেক্ষণ গল্প করলাম। সবসময় যে গল্প করলাম তা নয়, কখনো কখনো চুপ করে রইলাম দুইজনে। এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে দেখতে লাগলাম অন্ধকার সমুদ্রের বিরামহীন আছড়ে পড়া ঢেউ। আমার কখনও রাতের সমুদ্র দেখার ভাগ্য হয় নাই। এই প্রথম অন্ধকারে সমুদ্রের অন্য এক রূপ দেখতে পেলাম। এইভাবে বসে থাকতে থাকতে অনেক সময় পার হয়ে গেলো। আমাদের মোটেও উঠতে ইচ্ছা হচ্ছিলো না। কিন্তু রাত আটটা বেজে পার হয়ে গেছে। হোটেলে ফির যাওয়া প্রয়োজন। আমি আর সুমাইয়া উঠে পড়লাম। অন্ধকারে বালি পাড়িয়ে বিচ ছেড়ে ঢুকে গেলাম গলির ভেতর। হাঁটতে লাগলাম সোজা, হোটেলের উদ্দেশ্যে।

প্রথমেই হোটেলে না ঢুকে গেলাম ভিন্সি’স প্লেসে। রুবাইদাকে পেলাম সেখানে। কোনকিছু চিন্তা না করেই অর্ডার দিলাম মাশ্রুম ক্রিম পাস্তা। আবারও সেই মজাদার পাস্তা আসলো। গপাগপ খেতে লাগলাম আমি। এখানকার খাবারদাবার এত মজা যে কি আর বলবো!

খাওয়া শেষ করে সোজা হোটেলে ফিরে গেলাম। আগামীকাল প্যারাসেইলিং এর প্ল্যান করে সবাই ঘুমাতে গেলাম আমরা। আমি আবারও ফ্লোরে সটান হয়ে শুয়ে ঘুমিয়ে পড়লাম। সমুদ্রের বাতাসে আমার ঘুম ভালোই হতে লাগলো।

 

The Mighty INDIA CALLING: সুনীল সাগরের গোয়ায় পদার্পন এবং গোয়েলের বিদায় (পর্ব ২৮)

খুব ভোরে গোয়েল আমাদের নিয়ে এক বাজারের মতন জায়গায় থামে। আমাদের সবাইকে ডাকাডাকি করে উঠিয়ে দেওয়া হলো। আমরা ঘুম থেকে উঠে আড়মোড়া ভেঙ্গে বাস থেকে নেমে দেখি গ্রামের একটা ছোট্ট বাজারে এসে পড়েছি। এখনও কোন দোকানপাট খুলে নাই। এখানে থেমে আমাদের কি লাভ হলো বুঝতে পারছিলাম না। কমিটির লোকজন আমাদের জানালো সামনে আর কোন থামার জায়গা নাই। তাই এখানেই ফ্রেশ হয়ে নিতে হবে। কি আর করা, আমরা জনমানবশূন্য এক বাজারের মধ্য দিয়ে হাঁটতে লাগলাম।

সন্ধান পেলাম এক বাথরুমের। মেয়েদের জন্য একটা জায়গায় লাইন, একটু পাশেই ছেলেদের লাইন অন্য একটা বাথরুমের জন্য। মেয়েদের লাইনে আমি মোটামুটি মাঝের দিকেই দাঁড়ালাম। লাইনে দাঁড়িয়ে থেকে দেখতে পাচ্ছিলাম, একেকজন আতংকজনক চেহারা নিয়ে বাথরুম থেকে বের হচ্ছে। আমরা লাইনে যারা ছিলাম সবাই ভয় পেয়ে গেলাম, এতই খারাপ অবস্থা বাথরুমের! লাইনে একটু সামনে দাঁড়ানো নোভা সবার কাছ থেকে অভিজ্ঞতা শুনে আমাদের উদ্দেশ্যে ঘোষণা দিলো যে, এখানে দুইটা বাথরুম আছে। একটা খুব খারাপ, আরেকটা একটু কম খারাপ। আমরা খুব খারাপটাতে না গিয়ে একটু কম খারাপটাতে যাচ্ছি। তবে সেটার অবস্থাই এত খারাপ যে কেউ কিছু বলতে রাজি হচ্ছে না! আমি এই ফাঁকে ছেলেদের লাইনের দিকে গিয়ে খবর নিয়ে আসলাম ওদের বাথরুমের অবস্থা কেমন? আমাকে জাফর বললো, ‘এদিকের কথা জিজ্ঞেস করার কথা চিন্তাও করিস না’। আমি আর জিজ্ঞেস না করে চলে আসলাম।

যাই হোক একে একে সবাই আমরা ভয়ংকর এই পর্বটা শেষ করলাম। তারপর আমি গেলাম দাঁত মাজতে। রাস্তার পাশে ক্ষেতের ধারে একটা পানির কল পেলাম। কিন্তু কলটা বড়ই অদ্ভূত! সাধারণত কল ছাড়লে পানি উপর থেকে নিচে পড়ে, কিন্তু এই কল ছাড়লে পানি ডান থেকে বামে আড়াআড়িভাবে বের হয়। কল ছেড়ে মুখ ধুতে গিয়ে আমি প্রায় পুরো ভিজে গেলাম। আরও অনেকেই আসলো দাঁত মাজতে, আমি তাদের সবাইকে সাবধান করে দিলাম এই অদ্ভূত কলের ব্যাপারে। তাতেও খুব লাভ হলো না, কয়েকজন আবার আমার মতই ভিজে গেলো!

হাতমুখ ধোয়া শেষে যখন আবার রাস্তায় এসে উঠলাম, ততক্ষণে দোকানপাট খুলতে শুরু করেছে। আমি একটা দোকান থেকে কেক আর বিস্কুট কিনে নিলাম। এই দিয়ে নাশতা সারতে হবে। আমরা যখন কেক খাচ্ছিলাম তখন কোথা থেকে যেন এক বাস ভর্তি স্কুলের ছাত্রীরা এসে হাজির হলো। ইউনিফর্ম দেখে মনে হলো, গ্রামের কোন স্কুল হবে- হয় তো পিকনিক করতে বের হয়েছে। আমাদের মেয়েদের লাইন তখনও শেষ হয় নাই। আমরা মনে মনে হাসলাম, এদের তো অনেক দেরি হবে। কিন্তু আমাদের অবাক করে দিয়ে ওরা সবাই আরেকটা যে বাথরুম আছে ‘খুব খারাপ’, সেটাতে লাইন ধরে ঢুকতে লাগলো। মনে হলো আমরা সবাই মিলে কেন এক লাইনে দাঁড়িয়ে আছি সেইটা নিয়ে ওরা বেশ অবাক হয়ে গেলো!

খাওয়া শেষ করেই আমরা আবার দৌড়ে বাসে উঠলাম। মাইশার ফল কিনতে একটু দেরি হয়ে যাচ্ছিলো দেখে নিলয় দৌড় দিয়ে তাগাদা দিয়ে ওদের নিয়ে আসলো। আমাদের বাস আবার ছেড়ে দিলো। এবং বরাবরের মতই আমরা চলতে শুরু করলাম। আস্তে আস্তে কড়া রোদ বাড়তে লাগলো। বাসের এক পাশের জানালা দিয়ে গনগনে রোদ ঢুকতে লাগলো। আমরা সবাই যার যার কম্বল দিয়ে জানালা ব্লক করে দিলাম। কয়েকদিন আগেও কম্বলটা জড়িয়ে এই বাসের মধ্যেই ঘুমিয়েছি, আর এখন কম্বলটা দিয়েই রোদ আটকিয়ে গরম কমানোর চেষ্টা করছি, কি অদ্ভূত!

গুগল ম্যাপে যখন থেকে দেখাতে লাগলো গোয়ায় ঢুকে পড়েছি, তখন থেকেই চারপাশের দৃশ্যপট বদলে গেলো। সরু রাস্তা, দুপাশে দোতলা তিনতলা বাড়ি, অন্যরকম চেহারার মানুষজন আর প্রচুর সাদা চামড়ার টুরিস্ট দেখতে দেখতে আমরা এগিয়ে যেতে লাগলাম। এক পর্যায়ে আমাদের বাস এসে থামলো এক জায়গায়। কমিটির লোকজন হোটেলের খোঁজ খবর নিতে গেলো। আমরা অনেক্ষণ বাসে বসে রইলাম। তারপর গ্রিন সিগনাল পেয়ে সব মালপত্র নিয়ে নেমে পড়লাম গোয়েল থেকে। আমার একটা সোয়েটার ইচ্ছা করেই রেখে দিলাম গোয়েলে। আর একবার হার্ডব্রেক করার সময় প্যাকেটের ভিতর থেকে সুভেনিয়র হিসেবে রেখে দেওয়া ক্যাফে কফি ডের বেলজিয়ান চকো শটের ছোট্ট গ্লাসটা ছিটকে পড়ে গিয়েছিল। ঐটা আর খুঁজে পেলাম না। এই দুইটা জিনিস ছাড়াই হাজির হলাম গোয়েলের পিছনে লাগেজ নেওয়ার জন্য। শেষবারের মত পাংকু হেল্পার আমাদের লাগেজ নামিয়ে দিলো। গোয়েলকে টাটা বাই জানিয়ে কাঁধে হ্যান্ড ব্যাগ, পিঠে ব্যাগ প্যাক, হাতে খাবারের প্যাকেট আর বড় লাগেজ- এই চারটা জিনিস নিয়ে হাঁটতে লাগলাম। কাঁচা এবড়ো থেবড়ো রাস্তা দিয়ে ট্রলি ব্যাগটা টানতে টানতে কয়েক কদম সামনে যেতেই হাঁপিয়ে গেলাম।

দে
আমাদের গোয়েল (কৃতজ্ঞতায় রফিকুল ইসলাম তুষার)

দীর্ঘদিন পর সব লাগেজ একসাথে নিয়ে হাঁটছি, তাও আবার কাঁচা রাস্তায়! দম সব বের হয়ে গেলো। কিন্তু বসে থাকলে তো চলবে না, জোরে নিশ্বাস নিয়ে আবার হাঁটতে লাগলাম। আশেপাশে দেখতে লাগলাম সবারই প্রায় একই অবস্থা। আর দূরত্বটাও নেহায়েত কম নয়, গলির পর গলি হেঁটে যেতে লাগলাম। রাস্তা যেন শেষ হয় না। লাগেজ টানতে টানতে যখন হাতে লাল টকটকে দাগ পড়ে হাত অবশ হয়ে গেলো, পায়ের মাংসপেশী যখন টনটন করতে লাগলো, পরিশ্রমের চোটে আমাদের গাল, মুখ, চোখ যখন লাল হয়ে গেলো- তখন এক চিপার মধ্যে আমাদের রেস্ট হাউজের সন্ধান মিললো। একটা চিপা দিয়ে ঢুকলে ছোট্ট একটা উঠান, তার এক পাশে এক তলা একটা বাড়ি আর অন্য পাশে দোতলা একটা বাড়ি। একতলা বাড়িটাতে দুইটা রুম, দুইটাই ছেলেদের। আর দোতলা বাড়িটাতে মোট চারটা রুম, চারটাই মেয়েদের। আমি এসে দেখি নিচ তলার রুম দুইটায় অলরেডি মায়িশারা আর উর্মিরা উঠে পড়েছে। এই ভারি লাগেজ সিড়ি দিয়ে টেনে টেনে দোতলায় তুলে প্রথম রুমটাতেই ঢুকে আমি বিছানায় ধড়াম করে পড়ে গেলাম।

বিছানায় শুয়ে থাকতে থাকতেই দেখলাম মিম আর অন্তরা এসে বললো ওরাও এই রুমে থাকবে, প্রত্যেক রুমে বরাদ্দ ছয় জন করে। ওরাও মাল পত্র রেখে আমার মত ফ্ল্যাট হয়ে বিছানায় পড়ে গেলো। একে একে মৌলি, মজুমদার, রুবাইদা- সবাই এলো। মৌলি আর মজুমদার চিৎকার করে বলতে লাগলো, ‘গরম কাপড় সব ফেলে দিবো, সঅঅঅব- এই ব্যাগ টানা সম্ভব না’। আমরা খানিকটা ধাতস্থ হয়ে খেয়াল করলাম রুমটা মোটামুটি বড়। ডবল বেডটায় চারজন শোয়া যাবে আর বাকি দুইজনকে ফ্লোরিং করতে হবে। রুমে একটা এসিও আছে দেখে আমরা বেশ খুশি হয়ে গেলাম। বাথরুমটাও চমৎকার আর এই প্রথম কোন বাথরুমে আমরা হ্যান্ড হোস পাইপ পেলাম। আমরা যখন এইসব গবেষণা করছিলাম তখন রিন্তু এসে হাজির হলো। ওকেও এই রুমে থাকার জন্য পাঠানো হয়েছে। সব মিলিয়ে আমরা হলাম সাতজন!

ঝটপট করে আমরা আমাদের লাগেজ খুলে জামাকাপড় বের করে নিলাম। এতদিন পড়ে থাকা কেডসটাকে বারান্দায় দিলাম শুকানোর জন্য। বের করে নিলাম স্পঞ্জের স্যান্ডেল। সকল জিনস বাদ দিয়ে পায়জামা বের করে নিলাম। জামার সাথে পায়জামা আর স্কার্ফের কোন মিল নাই, কিন্তু তাতে কি? একটা হলেই হলো! এর মধ্যে আমি লক্ষ করলাম আমার হাত আর পায়ে বড় বড় জায়গা জুড়ে নতুন চামড়া উঠছে। মিম হাসি মুখে বললো, ‘পরিশ্রমের ঠ্যালায় তোর নরম চামড়া পড়ে গিয়ে শক্ত চামড়া উঠছে। তবে দেশে গিয়ে যখন আবার পরিশ্রম বন্ধ করে দিবি তখন আবার এই শক্ত চামড়া পড়ে গিয়ে নরম চামড়া উঠবে’। আমি একটা দীর্ঘশ্বাস ফেললাম। একটু ফ্রেশ হয়েই সবাই খাওয়া দাওয়ার জন্য বের হয়ে পড়লাম। আমাদের চিপাটার সামনেই ‘ভিন্সি’স প্লেস’ এ গেলাম সবাই মিলে।  গিয়ে চটপট একটা টেবিলে বসলাম। কি অর্ডার দিবো না দিবো ভাবতে ভাবতেই শুভ এগিয়ে আসলো। প্রত্যেকের হাতে ধরিয়ে দিলো কড়কড়ে এক হাজার রুপির নোট। খুশিতে আমরা চিৎকার দিয়ে উঠলাম! শুভ জানালো এটাই ওর ‘গোয়ার সারপ্রাইজ’। শুনে রুবাইদা বলে উঠলো, ‘সত্যিই খুশিতে চোখে পানি চলে আসছে’। এতদিন ধরে চলতে চলতে অনেকেরই টাকা পয়সায় টানাটানি পড়ে যাচ্ছে। গোয়ায় এমনিতেও সব কিছু একটু দামি, সেখানে হুট করে এক হাজার রুপি পাওয়া বিশাল ব্যাপার!

আমি আর অন্তরা ভেবে চিন্তে অর্ডার দিলাম ২২০ রুপির প্রন থালি। সমুদ্রের কাছাকাছি জায়গায় এসে মাছ জাতীয় খাবার খেতেই মন চাইলো। খুব বেশিক্ষণ অপেক্ষা করতে হলো না, তাড়াতাড়িই চলে আসলো প্রন থালি। চিংড়ি মাছের তিন রকমের পদ আর সাথে ভাত। মুখে দিয়েই মুগ্ধ হয়ে গেলাম, এত মজার খাবার! একটা পদ ছিলো ছোট চিংড়ি মাছকে সামুদ্রিক মাছের ডিম দিয়ে মাখিয়ে মচমচে ফ্রাই। খেতে এতই মজা ছিলো, কি আর বলবো- আমি আর অন্তরা কোন কথাবার্তা না বলে গপাগপ খেতে লাগলাম।  আশেপাশে যারা ছিলো তারা সবাই নিজেরদেরটা খেয়ে টেস্ট খুবই হাই ক্লাস বলতে লাগলো। আমি বুঝলাম, গোয়ার খাবারের দাম যেমন বেশি, টেস্টটাও সেইরকমই!

ভরপেট খাওয়া দাওয়া করে আমরা বিচে ঘুরতে গেলাম। আমরা যেই জায়গাটায় আছি সেটার কাছাকাছি যে বিচটা সেটার নাম কালাংগুটে বিচ। বলতে গেলে আমাদের রেস্ট হাউজ থেকে খুবই কাছে, দুই মিনিটের হাঁটা পথ। সবাই দল বেঁধে বিচে গেলাম। মোটামুটি শান্ত বিচ, তেমন কোন ভিড়ভাট্টা নাই। সবাই নামতে শুরু করলো পানিতে। জোয়ারের সময়, তাই চিন্তার কিছু নাই। তার উপর সমুদ্রে সেফ জোনের মোটামুটি একটা সীমানা টানা আছে, সেই সীমানা ক্রস করলেই লাইফ গার্ড টাইপের লোকজন বাশি ফুঁ দিতে দিতে চলে আসে। বিশাল সমুদ্রের ঢেউয়ের ঝাপটায় আমাদের সব ক্লান্তি মুছে গেলো নিমেষেই।  আমি পায়ের গোড়ালি ভিজিয়ে বিচ ধরে হাঁটতে লাগলাম। গোয়ার বিচটা কক্সবাজারের মত এত সুন্দর বলে মনে হলো না। তবে বিচে অনেক রকম অ্যাক্টিভিটি করার সুযোগ আছে, যেমন প্যারাসেইলিং, ওয়াটার স্কুটার, স্পিডবোট ট্রিপ, ব্যানানা রাইডিং সহ আরও অনেক কিছু। বিচ দিয়ে দৌড়ে বেড়াচ্ছে ছোট ছোট জিপ গাড়ির মত এক ধরনের গাড়ি। আর একেবারেই বিচের পাশেই বড় বড় শ্যাক। সেখানে সি ফুডের পাশাপাশি নানা রকম অ্যালকোহলের বোতলও সাজিয়ে রাখা হয়েছে সুন্দর করে। এই সব কিছু মিলে বিচটাকে আকর্ষনীয় করে তুলেছে। কিন্তু কক্সবাজারকে আমার মনে হয়েছে আলগা জিনিসপাতি দিয়ে আকর্ষনীয় করার দরকার নাই, সে নিজেই চমৎকার!

এর মধ্যে আমাদের কয়েকজন দেখলাম স্পিড বোটওয়ালার সাথে দরাদরি করছে। বোট ঠিক হয়ে গেলে আমরাও উঠে পড়লাম। প্রত্যেকের জন্য আলাদা সিট, সাথে আবার লাইফ জ্যাকেট পড়ে বসতে হয়। আমাদের নিয়ে বোট ঘুরে আসলো কয়েক মিনিট। বোট থেকে নেমে আমরা ভাড়া মিটিয়ে দিলাম পার হেড ৮০ রুপি করে। আবার গোড়ালি পানির উপর দিয়ে হেঁটে হেঁটে কালাংগুটে বিচের দিকে যেতে লাগলাম। গিয়ে শুনলাম ঢেউয়ের ঝাপ্টা ফাহাদের পকেট থেকে সানগ্লাস আর নিলয়ের পকেট থেকে হোটেল রুমের চাবি ভাসিয়ে নিয়ে গেছে। আমরা এই নিয়ে বেশ হাসাহাসি করলাম। ততক্ষনে সূর্য প্রায় ঢলে পড়েছে। সবাই মিলে সূর্যাস্ত দেখলাম। বিশাল কমলা আকাশে টুপ করেই হারিয়ে গেলো ছোট সূর্যটা। সবার জামাকাপড়ই ভেজা, আর লবন বালিতে শরীর কুটকুট করতে লাগলো। সবাই সময় নষ্ট না করে রওয়ানা দিলো হোটেলের উদ্দেশ্যে।

দফচ
গোয়ার সমুদ্রে সূর্যাস্ত (কৃতজ্ঞতায় রফিকুল ইসলাম তুষার)

রুমে গিয়েই সবার আগে মৌলি গোসলে ঢুকলো। তারপর মজুমদার। মজুমদারের গোসল অর্ধেক হওয়ার পর পানি শেষ হয়ে গেলো। ও বাথরুম থেকে চিৎকার করতে লাগলো পানির জন্য। আমি পাশের রুমে গেলাম। গিয়ে শুনলাম ওদের বাথরুমে বাসিরুনও গোসল করতে গিয়ে পানির অভাবে আটকা পড়ে আছে। বারান্দা দিয়ে নিচে তাকিয়ে ছেলেদের ডাকাডাকি করলাম। কৌশিক বের হয়ে আসলো। ও বললো কলে পানি নাই, কিন্তু আধা বালতি পানি আছে। চাইলে সেটাই নিতে পারি। কি আর করা তাই নিতে রাজি হলাম। সিঁড়ি দিয়ে নেমে আসতে আসতে দেখলাম শান্ত মুখে ফেসপ্যাক লাগিয়ে বসে আছে। আমি পানি নিয়ে যাচ্ছি দেখে ও বললো ওর নাকি মুখ ধুতেই এই পানি লাগবে।  এই নিয়ে কথা বার্তা হতে হতেই উপর থেকে খবর আসলো যে কলে পানি চলে এসেছে।

একে একে আমরা সবাই গোসল করলাম। আমরা গোসল শেষে সব কাপড় চোপড় ধুয়ে বারান্দায় মেলে দিলাম। এই প্রথম কোন জায়গায় আমরা স্বাধীনভাবে ধোয়া কাপড় মেলে শুকাতে দিতে পারছি। কাপড় মেলে দিতে দিতে যখন পুরো বারান্দা ভরে গেলো তখন আমরা সিঁড়ির রেলিংগুলোতেও কাপড় মেলে দিতে লাগলাম। গোসল এবং কাপড় চোপড় ধোয়ার ফলে বাথরুমে বালির স্তুপ জমে গেলো আর সারা রুম কেমন কাদাকাদা হয়ে গেলো। সবার শেষে বাকি ছিলো রুবাইদা। ও বললো ও ই নাকি সারা রুম গুছিয়ে পরিষ্কার করে দিবে। আমরা ওর গোসল হওয়া পর্যন্ত অপেক্ষা করতে চাইলাম, কিন্তু ও আমাদের সবাইকে ঘুরে আসার জন্য বললো। আমি বিপদ আপদের কথা তুলতেই সাহসী রুবাইদা সেগুলো হেসেই উড়িয়ে দিলো। আমরা বললাম তারপরও আমরা দূরে কোথাও যাচ্ছি না, আমাদের বাকি লোকজনের জন্য আরেকটা যে রেস্ট হাউজ আছে সেটাতেই যাচ্ছি। একটু পর চলে আসবো।

আমাদের বারান্দা থেকেই দেখা যায় আরেকটা রেস্ট হাউজ। রাস্তায় নেমে হাতের বাম পাশে কয়েকটা বাসা পার হলেই চলে আসে সেই বিল্ডিঙ্গটা। নিচ তলায় আমাদের কেউ নাই। সিঁড়ি বেয়ে উপরে উঠে গেলাম। নিশাত তখনও রেডি হয় নাই। আমি বারান্দায় দাঁড়িয়ে নিশাত, তমা, পৃথ্বীদের জন্য অপেক্ষা করতে করতে দেশে ফোন দিলাম। আম্মুর সাথে কথা বললাম। আম্মু বারবার সমুদ্র থেকে দূরে থাকার জন্য সাবধান করে দিলো। বাসার সবার কথা জিজ্ঞেস করলাম। শুনলাম ভাতিজা ছোট্ট ওয়াফির জন্য ওর মামি একটা খেলনা এনে দিয়েছে সেইটা নিয়ে ও এখন সারাদিন ব্যস্ত থাকে।

ওদিকে নিশাত, তমা আর পৃথ্বীর হয়ে যেতেই আমরা নেমে পড়লাম। আমি আবার আমাদের রেস্ট হাউজে ছুটে গেলাম রুবাইদার জন্য। গিয়ে দেখি এলাহি কারবার! রুবাইদা ওর রিজেক্টেড জামাকাপড় সব বের করে একটা জামা দিয়ে সারা রুম মুছে চকচকে করে ফেলেছে। একটা পাতলা সোয়েটার রেখেছে বাথরুমের সামনে পাপোশ হিসেবে ব্যবহার করার জন্য। সবার এলোমেলো লাগেজ সব এক পাশে সরিয়ে ফ্লোরে শোবার জন্য বন্দোবস্ত করে রেখেছে। এত কিছু করতে গিয়ে ওর গোসলে যাওয়াই হয় নাই। আমি রুমে থাকতে চাইলেও আমাকে ও জোর করে ডিনার খাওয়ার জন্য রিন্তু, তমাদের সাথে পাঠিয়ে দিলো। কি আর করা, রুবাইদাকে ছাড়াই আমরা খেতে চলে গেলাম।

আমরা সবাই মিলে হাঁটতে লাগলাম রাস্তা দিয়ে। চিপা চিপা অন্ধকার গলি গলি রাস্তাগুলো দেখতে সুবিধার লাগে না। অনেক ডান বামে ঘুরে শেষমেশ আমাদের গোয়েল যেখানে নামিয়ে দিয়েছিলো সেখানে পৌঁছে একটা সুন্দর রেস্টুরেন্ট পেলাম যার নাম ‘ভিক্টোরিয়া হোটেল’। কোন একটা বাড়ির উঠানে ছনের ছাউনি দিয়ে সুন্দর টেবিল চেয়ার পাতা আছে। বেশ ঘরোয়া পরিবেশ। ঢুকেই দেখি পাশের টেবিলে রিজভী, তুষার, জেরিন, আদিবা, আফরা- ওরা বসে আছে। আমরাও চটপট অর্ডার দিলাম। আমি শেয়ারে নিলাম মিক্সড ফ্রায়েড রাইস আর প্রণ চিলি। মিম নিলো কালামারি। আমরা সবাই এক জন আরেকজনেরটা শেয়ার করলাম। রান্না খুবই মজা ছিলো। আমরা গোয়ার রান্নার প্রেমে পড়ে গেলাম। হাসি আর গল্পগুজবের মধ্যে আমাদের খাওয়া শেষ হলো। আমার ভাগে বিল আসলো ১৫৮ রুপি। সব বিল মিটিয়ে দিয়ে আমরা বের হয়ে আসলাম। আমাদের আরও কিছুক্ষণ ঘোরাঘুরি করার শখ ছিলো। কিন্তু নির্জন অন্ধকার রাস্তাঘাট দেখে আর ঘুরতে ইচ্ছা হলো না। আমরা আবার হেঁটে হেঁটে আমাদের হোটেলের দিকে যেতে লাগলাম।

আবার সেই অন্ধকার গলিঘুপচি দিয়ে যেতে যেতে এক সময় আমাদের মনে হলো, ঠিক রাস্তায় যাচ্ছি তো? ভালো করে ডান বাম দেখে হাঁটতে হাঁটতে একসময় দেখা হলো সুমাইয়া, রাফাত আর শান্তর সাথে। ওদের কাছে শুনলাম, কৌশিক হাতে একটা ড্রাগন ট্যাটু করিয়েছে। রাফাত ওর মোবাইলে ভিডিও দেখালো। আমরা দেখলাম ড্রিল মেশিনের নিচে হাত রেখে গলা ফাটিয়ে চিৎকার দিচ্ছে কৌশিক। তারপর সুমাইয়া আমাদের সাথে যোগ দিলো। আমরা সবাই একসাথে ভিন্সি’স প্লেসে ঢুকলাম। দেখি রুবাইদা সুন্দর একটা টেবিলে একা বসে আছে। আমরা গিয়ে যোগ দিলাম ওর টেবিলে। ও নাকি কি এক পাস্তা অর্ডার দিয়েছে। অর্ডার নেয় যে লোকটা সে ওকে বলেছে আমাদের সবাই নাকি এটাই নিচ্ছে।

ওর অর্ডার আসলে আমরা একটু টেস্ট করে দেখলাম। অসাধারণ টেস্ট! আমি চটপট একটা অর্ডার দিয়ে দিলাম, ‘মাশ্রুম ক্রিম পাস্তা’। আমি সাধারনত শখ করে পাস্তা খাই না। কিন্তু এই পাস্তাটা এতো মজা যে আমি ভরা পেটেও শেয়ারে একটা অর্ডার দিয়ে ফেললাম। বিশাল এক থালা ভর্তি শশা দিয়ে সাজানো সাদা ক্রিমে মাখানো পাস্তা এসে হাজির হলো। পুরো ট্যুরে এই প্রথম কোন এক জায়গায় আমি শশা পেলাম। এই দেশে সবাই সালাদ বলতে পিয়াজ অথবা মুলা কুচিকে বোঝে। শশা বা টমেটু যে সালাদ হিসেবে খাওয়া যায় সেটা এরা জানেই না। বহুদিন পর শশা পেয়ে ঝাপিয়ে পড়লাম আমি। পাস্তা মুখে দেওয়ার আগেই শশাগুলো চিবাতে লাগলাম। আর মজাদার পাস্তাটার কথা আর নাই বা বললাম- আমি পাস্তার সাথে সাথে নিজের প্লেটের সব শশা শেষ করে সুমাইয়ার প্লেটের শশাগুলোও খেয়ে ফেললাম। খাওয়া শেষে চেখে দেখলাম সি ফুড সুপ। উফ, সুপটাও এত্ত মজা-

পেট ওভার লোডেড করে আমরা যার যার রুমে ফেরত আসলাম। নিশাতের রুমের চাবি অন্যের কাছে। ওরা এখনও আসে নাই। তাই বললাম নিশাতকে আমাদের সাথে থেকে যেতে। আমাদের এক্সট্রা তোষক দিয়ে গেছে। নিচে আমরা ফ্লোরিং করলাম। রুবাইদা এক পাশে, আমি, নিশাত আর রিন্তু আরেক পাশে। সারা দিনে কম কষ্ট হয় নাই। তাই বেশি দেরি হলো না, ঘুম চলে আসলো।

 

 

The Mighty INDIA CALLING: পথ হারিয়ে এক বিকেলে অজন্তার রহস্যময় গুহায় (পর্ব ২৬)

ঘাড়, কোমর আর হাঁটুর টনটনে ব্যাথার কারনে একটু পরপর ঘুমে ব্যাঘাত ঘটছিলো। এই করতে করতে টের পেলাম খুব সকালবেলা আমাদের গোয়েল থামলো এক ধাবাতে। আমরা আড়মোড়া ভেঙ্গে আস্তে ধীরে নামতে লাগলাম। রুবাইদাকে দেখলাম ব্যাগ খুলে বদনা বের করে আনতে। আমরা সবাই খুশি হলাম, যাক- বোতল আর খুঁজতে হলো না। ফ্রেশ হয়ে দাঁতটাত মেজে ধাবাতে খাওয়াদাওয়া খোঁজ করলাম, তেমন কিছুই নাই। জ্যাব্জ্যাবে তেল দেওয়া একটা পরোটা পাওয়া যাচ্ছে। দেখে খাওয়া পছন্দ হলো না। তাই কিছু না খেয়েই আবার বাসে চড়ে বসলাম। বাস চলতে শুরু করলো।

যতভাবেই বসে থাকি, একটু গা এলিয়ে দিলেই ঐ তিনটা পয়েন্টে টনটনে ব্যাথা শুরু হয়ে যায়। বেলা বাড়ার সাথে সাথে আমাদের কথাবার্তাও বাড়তে থাকে। এক সময় ঘুম ঘুমভাব ছেড়ে পুরা বাস জেগে ওঠে। আমরা নিজেরা হৈচৈ করেতে থাকি। কিন্তু কতক্ষণ আর হৈচৈ করা যায়, পথ তো শেষ হয় না। অনেকে উশখুশ করতে থাকে- ঘড়ি দেখতে থাকে। গুগল ম্যাপ বের করে খোঁজাখুঁজি করা শুরু হয়। সব দেখে মনে হতে থাকে আমরা বোধহয় গন্তব্য থেকে দূরে সরে যাচ্ছি। ব্যাপারটা সঠিক কিনা জানার জন্য নানাভাবে গবেষণা শুরু হয়। একসময় সত্যিই মনে হতে থাকে আমরা ভুল রাস্তায় যাচ্ছি। কমিটির লোকজন ড্রাইভারকে গিয়ে একথা জানায় কিন্তু ড্রাইভারের কোন ভাবান্তর নাই। সে একমনে বাস চালিয়ে যেতেই লাগলো। আমরা ম্যাপে দেখতে লাগলাম আমরা কোথায় যাচ্ছি। প্রতি মূহুর্তে আমরা আওরংগবাদ থেকে কয় কিলোমিটার দূরে সরে যাচ্ছি নিলয় এসে আপডেট দিতে লাগলো।

এতদিন ট্যুর করে আমরাও কেমন যেন অদ্ভূত টাইপের মানুষ হয়ে গেছি। কোথায় সবাই ভয় পেয়ে চিৎকার চেঁচামেচি জুড়ে দিবে- তা নয়। বরং সবাই বেশ ঠাট্টা তামাশা করতে লাগলো যে আমরা পথ হারিয়েছি। আমরা নিজেরা নিজেরা রাস্তা হারিয়েছি বলে হাসি তামাশা শুরু করে দিলাম। এভাবে মোটমাট ঘন্টা দুয়েক চলার পর আমরা ম্যাপে রিডিং দেখলাম যে সঠিক পথে যাচ্ছি, গন্তব্যের সাথে আমাদের দূরত্ব কমতে লাগলো। তবে বাস চলতেই লাগলো। আমরা ধৈর্য ধরে বসেই রইলাম।

মোটমাট ১২-১৪ ঘন্টার জার্নি ১৮ ঘন্টায় শেষ করে আমরা নামলাম সরাসরি অজন্তায়। গনগনে দুপুরবেলায় আমরা বাস থেকে নেমে হাত পা ছুঁড়তে লাগলাম। সামনে একজন লোক পেয়ারা নিয়ে বসে ছিলো। ১০ রুপি দিয়ে সুন্দর একটা পেয়ারা কিনে তাতে কামড় বসিয়ে দিলাম। একেবারে খালি পেটে ফল খেতে হলো, আল্লাহ আল্লাহ করলাম পেটে যেন কোন সমস্যা না হয়। কমিটির লোকজন টিকেট কেটে আনতে গেলো। আমি বসে বসে পেয়ারা চিবাতে লাগলাম। কমিটির মধ্যে আমাদের শিডিউল নিয়ে একটা সমস্যা হচ্ছে টের পাচ্ছিলাম। সত্যি সত্যি শুভ ঘোষনা দিলো, আমাদের হিসাব থেকে মূল্যবান ৬ ঘন্টা হারিয়ে গেছে এই অজন্তায় আসার পথে। আমাদের পরবর্তী গন্তব্য মুম্বাই যেটা এখান থেকে আরও ৭-৮ ঘন্টার জার্নি। মুম্বাইয়ে আমাদের আধা বেলা থাকার কথা ছিলো তারপরই রওয়ানা দেওয়ার কথা গোয়ার উদ্দেশ্যে। গোয়ায় নির্দিষ্ট সময়ে আমাদের বাস ছেড়ে দিতে হবে তাই সেটার নড়চড় করা যাবে না। এখন মুম্বাইয়ের দিকে যাওয়া সম্ভব না কারণ ড্রাইভারকে ঘুমাতে দিতে হবে। আর যদি কষ্টকরে আমরা যাইও ৭-৮ ঘন্টা জার্নি করে, মাত্র কয়েকঘন্টার মধ্যে আমাদের আবার একটা বড় জার্নি করতে হবে গোয়ার উদ্দেশ্যে। তাই সব কিছু চিন্তা করে কমিটি ডিসিশন নিয়েছে আমাদের মুম্বাই ট্রিপ ক্যান্সেল। তারচেয়ে বরং আজকে রাতে আমরা আওরঙ্গবাদে থেকে যাবো। কাল ইলোরা দেখে সেখান থেকেই গোয়ার উদ্দেশ্যে রওয়ানা হবো।

মুম্বাই বাতিল হয়ে যাওয়ায় আমাদের মন খারাপ হয়ে গেলো। কিন্তু অনেকেই পড়লো বিপদে যেমন- রাত্রি। রাত্রির চাচাতো ভাইয়ের বাসা মুম্বাইয়ে। সেখানে ওর সাথে দেখা করার জন্য ওর চাচা আরেক শহর থেকে ফ্লাই করে এসে বসে আছে। আজকে সকাল পর্যন্ত ও চাচার সাথে যোগাযোগ করে বলে এসেছে যে ও আসছে মুম্বাই। এখন ও না গেলে ব্যাপারটা খুব খারাপ হয়। এই নিয়ে ও বেশ টেনশনে পড়ে গেলো। অন্যদিকে মৌলির বাবা মুম্বাইয়ের এক লোকের মাধ্যমে মৌলির কাছে টাকা পাঠাচ্ছে। এখন মুম্বাই না গেলে কেমন করে সেই টাকা ও যোগাড় করবে? সব কিছু মিলিয়ে আমরা কিছুটা মন খারাপ, কিছুটা দুঃখ, কিছুটা আশংকা নিয়ে ঢুকতে লাগলাম অজন্তায়।

দূর থেকে দেখা পাহাড়ের গায়ে অজন্তার গুহা
দূর থেকে দেখা পাহাড়ের গায়ে অজন্তার গুহা

হাঁটতে লাগলাম অনেক দূর। কেমন যেন বাজারঘাট, পার্ক -সব পার হয়েও আমরা হাঁটতে লাগলাম। তারপর পেলাম এক বাস। ৪০ রুপি দিয়ে টিকেট কেটে সবাই উঠে পড়লাম সেই বাসে। বাস আমাদের নিয়ে পাহাড়ি ঢাল বেয়ে উঠতে লাগলো। প্রায় ১৫-২০ মিনিট জার্নির পর আমাদের নামিয়ে দিলো এক জায়গায়। সেখান থেকে হেঁটে হেঁটে আমরা চলে গেলাম অজন্তার গুহাসারির সামনে। গুহা সারি বললাম এই কারণে যে পাথুরে পাহাড়ের এক পাশে খাদ আর অন্য পাশে সারি সারি গুহা। আমরা হেঁটে হেঁটে একেকটা গুহায় ঢুকতে লাগলাম। প্রথমে কারুকাজ করা কলাম ওয়ালা একটা গুহায় ঢুকলাম। ভেতরটা বেশ অন্ধকার। কিন্তু এর মধ্যে ইলেক্ট্রিক বাল্বের হালকা নীলচে আলোয় জ্বলজ্বল করছে বিশাল এক বুদ্ধ মূর্তি। আমরা সবাই অন্ধকারে দাঁড়িয়ে মুর্তিটার দিকে তাকিয়ে রইলাম। কেমন যেন অদ্ভূত অনুভূতি হলো। হাজার হাজার বছর আগে কতশত মানুষ কতই না কষ্ট করে আসতো -এই গুহাগুলোতে –ইলেক্ট্রিক লাইট বিহীন এই ঘুটঘুটে অন্ধকার জায়গায়-  এই সব ভাবতে ভাবতে কেমন যেন গায়ে কাঁটা দিয়ে উঠতে লাগলো আমার। ছাদের দিকে তাকিয়ে দেখলাম, লাল নীল রঙয়ের জ্যামিতিক কারুকাজে ভরা পুরা সিলিংটা যার বেশিরভাগই নষ্ট হয়ে গেছে কিন্তু অনেকাংশই টিকে আছে হাজার বছর ধরে। আবছা আলোয় দেওয়ালের হাতে আঁকা রঙ্গিন ফ্রেস্কো চিত্রকর্ম দেখে থ হয়ে গেলাম। হাজার বছর আগের এই পাহাড়ি গুহার  দেওয়াল ও ছাদ জুড়ে থাকা রঙ্গিন সব জটিল কারুকাজ, ফুলেল নকশা ও চিত্রকর্ম দেখে নিজেকে কেমন যেন বেকুব বেকুব লাগলো।

এক নম্বর গুহায় দ্বিমিকবাসী
এক নম্বর গুহায় দ্বিমিকবাসী

এক নম্বর গুহা থেকে বের হয়ে আমরা পরের গুহাগুলোর দিকে হাঁটতে লাগলাম। দেখতে লাগলাম আরও অনেক মূর্তি, এদের কোনটা বুদ্ধের, কোনটা অন্যদের, কোনটা অনেক বড়, কোনটা আবার ছোট্ট, কোনটা দাঁড়ানো, কোনটা বসা, কোনটা আবার নাচের ভঙ্গিতে। দেখলাম পুরোহিতদের ঘুমানোর জন্য পাথুরে দুইটা বিছানাসহ ছোট্ট ছোট্ট ঘর। আরও দেখলাম চৈত্য হল, চৈত্য জানালা, প্রদক্ষিণ পথ, স্তুপা- বইয়ে যা যা পড়েছিলাম সবই! এইভাবে একে একে দেখা হয়ে গেলো ৩০ টা গুহা। শেষের দিকে এসে প্রায় দৌড়ে দৌড়ে যাচ্ছিলাম কারণ গুহা বন্ধ হয়ে যাওয়ার সময় হয়ে আসছিলো। এক পাশে অদ্ভূত সুন্দর সবুজ পাহাড়ের নৈসর্গিক দৃশ্য, অন্য পাশে মানব সৃষ্ট পাথর কেটে বানানো হাজার বছরের পুরানো গুহা- দেখতে দেখতে কখন যে দিনে আলো কমতে শুরু করেছিলো তা টেরই পাই নাই। তাই শেষে দৌড়ে দৌড়ে অজন্তা থেকে বের হয়ে যেত লাগলাম আমরা। আশেপাশে বসে থাকা বানরগুলো আমাদের দিকে মুখ ভ্যাংচাতে লাগলো, সেই দিকে পাত্তা না দিয়ে আমরা ৪৬ জন তাড়াহুড়া করে পার হতে লাগলাম পাথুরে রাস্তা।

দফ
মা বানর ও বাচ্চা বানর (কৃতজ্ঞতায় রফিকুল ইসলাম তুষার)

অজন্তা থেকে বের হতে হতেই হুড়াহুড়ি করে বাসে উঠলাম আমরা। বাস আমাদের যখন সেই বাজার টাইপের জায়গায় নামিয়ে দিলো তখন সন্ধ্যা হয়ে গেছে। সেই সকাল থেকেই কিছু খাওয়া হয় নাই। আমরা কোন ভাবনা চিন্তা না করেই সবাই ভাগ হয়ে দুইটা দোকানে বসে পড়লাম। আমি আর রুবাইদা অর্ডার দিলাম ৫০ রুপির পাও ভাজি। রুবাইদা মুম্বাই গিয়ে পাও ভাজি খাওয়ার প্ল্যান করে রেখেছিলো, যেহেতু মুম্বাই ক্যান্সেল- তাই এখানেই চেখে ফেললাম পাও ভাজি। এটা তেমন আহামরি কোন খাবার নয়। বনরুটির সাথে মটরের ডাল জাতীয় একটা তরকারি দেওয়া হয় যার উপর অনেক পিঁয়াজ কুচি ছড়ানো থাকে। খেতে খারাপ মোটামুটি। এমন একটা টাইমে খেলাম যে বুঝতে পারছিলাম রাতে আর খাওয়া হবে না। আমরা তাই ধীরে সুস্থে আয়েশ করে খেলাম। খাওয়াদাওয়া শেষে অনেকে কেনাকাটা করতে লাগলো। ঐশী, নোভারা দরাদরি করে পাথরের মালা মোটামুটি কম দামেই কিনতে লাগলো। আমি ঘুরে ফিরে বিস্কুটের প্যাকেট কিনে নিলাম ঘুমানোর আগে খাওয়ার জন্য। মোটমাট রাত আটটার দিকে আমরা গোয়েলে গিয়ে উঠলাম।

গোয়েল আমাদের নিয়ে গেলো হোটেল মুরলি মনোহরে। গোয়েল থামতেই টের পেলাম মজুমদার অসুস্থ। মৌলি ওকে ধরে বসে আছে। আমাদের ও বললো রুমে চলে যেতে। আমি আর রুবাইদা রুমে চলে গেলাম। বেশ ছিমছাম একটা হোটেল। বেশ বড় রুম, সাথে ঝকঝকে বাথরুম আর বড় একটা খোলা বারান্দা। রুমে ঢুকেই প্রথমে রুবাইদা গেলো গোসলে। আমি ততক্ষণে জিনিসপত্র গুছিয়ে রেডি হয়ে বসে আছি গোসলে যাবার জন্য। মজুমদার রুমে এসেই শুয়ে পড়লো বিছানায়, মৌলি বললো একবার বমি করেছে- খাওয়াটা মনে হয় সুবিধার ছিলো না। রুবাইদা বের হতেই আমি গোসলে ঢুকলাম। বাথরুম থেকেই টের পেলাম রুমে বেশ চিৎকার-হৈচৈ হচ্ছে। তাড়াতাড়ি গোসল শেষ করে বের হয়ে দেখলাম মজুমদার বলতে গেলে কারও ডাকেই সাড়া দিচ্ছে না। খুব খারাপ লাগছে নাকি ওর। রুম ভর্তি মানুষজন। একেক জন একেক সাজেশন দিতে লাগলো। তবে সবাই এক বাক্যে বললো, ওষুধ খাওয়ানোর আগে পেটে খাওয়া দিতে হবে। শুভ নাকি ভাত খুঁজতে বের হয়ে গেছে। এই মহারাষ্ট্রে এসে এত রাতে ভাত খুঁজে পাওয়া কি সোজা কথা? কিন্তু আমাদের অবাক করে দিয়ে শুভ কোথা থেকে যেন এক প্যাকেট ভাত, কড়া একটা ডিম ভাজা, লাল মরিচ দিয়ে বাগার দেওয়া ঘন ডাল নিয়ে আসলো। এই দৃশ্য দেখে মজুমদার শত অসুস্থতার মধ্যেও আবেগে আপ্লুত হয়ে গেলো! রুম সার্ভিসে খবর দিয়ে একটা প্লেট আনালাম। সেই প্লেটে শক্ত ভাত ডাল দিয়ে মেখে আমি মজুমদারকে খাওয়াতে লাগলাম। মজুমদার মুখ বিকৃত করে ডাল ভাত গিলতে লাগলো। একটু খাওয়ার পরই আমরা ওকে স্যালাইন আর অ্যান্টাসিড খাইয়ে দিলাম। ও পড়ে ঘুম দিতে লাগলো। ওদিকে সৌরভের বার্থডে পার্টি ছিলো রাতে। মজুমদার অসুস্থ বলে আমরা কেউ গেলাম না। আমাদের একটা এক্সট্রা তোষক দিয়ে গেলো রুম সার্ভিস থেকে। রুবাইদা সেখানে নিজের শোবার ব্যবস্থা করলো। এরই মধ্যে উঠলো ঝড়! আক্ষরিক অর্থেই ঝড়! ঠিক যেন কাল বৈশাখি!

হঠাৎ করে প্রবল বাতাসের ঝাপ্টায় জানালার কাঁচ থরথর করে কেঁপে উঠলো। আমি দৌঁড়ে বারান্দায় মেলে দেওয়া কাপড়, জুতা নিয়ে আসতে গেলাম। বারান্দায় গিয়ে আমার মনে হলো এটা বোধহয় ধুলি ঝড়। চোখে মুখে প্রচন্ড বাতাসের সাথে বালির ঝাপটা এসে লাগলো। আমি অল্প একটু চোখ ফাঁক করে দেখলাম আশেপাশে আর কিছুই দেখা যাচ্ছে না। সব ঢেকে গেছে ধুলার কুয়াশায়। তাড়াতাড়ি ঘরে ফিরে বন্ধ করে দিলাম বারান্দার দরজা। মজুমদারের পাশে আমি লম্বা হয়ে শুয়ে পড়লাম। ভাবলাম ইন্ডিয়ায় এসে ধুলার ঝড়ের সাথেও দেখা হয়ে গেল, কি ভাগ্য!

The Mighty INDIA CALLING: CEPT, NID, IIMA -সব শিক্ষা প্রতিষ্ঠান দেখার একটি ‘শিক্ষনীয়’ দিন (পর্ব ২৫)

আগেই বলেছিলাম বেজমেন্টের রুমে দিনরাত বোঝা যায় না। তাই আবারও আমাদের উঠতে দেরি হয়ে গেলো। ঘুম থেকে উঠেই তাড়াহুড়া করে রেডি হয়ে বের হয়ে পড়লাম। নাস্তা না খেয়েই ছুটলাম একেবারে ঝড়ের বেগে। সেপ্টের সাথে সময় ঠিকঠাক করে রাখা আছে। দেরি করে গেলে ব্যাপারটা লজ্জার হবে। আমাদের মত অন্য সবাইও ছুটলো ঝড়ের বেগে। আমরা একটা অটো ঠিক করে নিলাম। অটোতে উঠে গুগল ম্যাপটা খুলে বসলাম। মাঝে একবার ড্রাইভারকে রাস্তা বলে দিতে হলো। তারপর ঠিকঠাক এসে পড়লাম সেপ্টে।

গেট দিয়ে ঢুকে দেখলাম আমাদের কেউ নাই। বুঝলাম তাড়াহুড়া করে আমরাই সবার আগে এসে পড়েছি। আমরা গেটের কাছে বসে রইলাম। খুব সুন্দর পরিবেশ। অনেকটা আমাদের মিন্টো রোডের বাড়িগুলোর মতন অবস্থা। চারিদিকে সবুজ গাছ আর হাজার পাখির কিচিরমিচির। সকাল বেলা সবকিছু শান্ত চুপচাপ, এর মধ্যে আমরা কয়েকজন বসে আছি হাফ ওয়ালে আর আমাদের সামনে দিয়ে শিক্ষার্থীরা হেঁটে হেঁটে যেতে লাগলো। আমি এই সুযোগে ব্যাগ থেকে ‘থ্রি মিস্টেক্স অফ মাই লাইফ’ বের করে পড়তে লাগলাম পা ঝুলিয়ে।

ছায়া ঘেরা CEPT ক্যাম্পাস
ছায়া ঘেরা CEPT ক্যাম্পাস

একে একে সবাই আসলে আমরা ভিতরে ঢুকে পড়ি। ঢুকতেই আমরা একটা ক্যাফের সামনে থেমে পড়ি। জাফরের দেখাদেখি ২৫ রুপির বাটার টোস্ট অর্ডার দিলাম। ক্যাফের লোকগুলা এত্ত ঢিলা যে আমার মনে হলো অনন্তকাল অপেক্ষা করার পর আমি একটা বাটার মাখানো টোস্ট পেলাম। আহামরি কিছু না। তবে ২৫ রুপি দামটা বেশি লাগলো।  নাশতা খাওয়া হয়ে গেলে আমরা এদিক সেদিক ঘুরে বেড়াতে থাকি। ওপেন স্পেস গুলা খুব মজার। এখানে সেখানে হুটহাট করে আমরা বসে পড়ি। ওদের স্টুডিওগুলা দেখলাম। একটাতে তো জুরি চলছে। খানিক্ষণ দাঁড়িয়ে জুরি দেখলাম। স্টুডিওগুলা বেশ ইন্টারেক্টিভ। ছিম ছাম সাজানো স্পেসগুলো ঘুরে বেড়াতে আমাদের খুব ভালো লাগছিলো। এখানে ভারতীয়দের সাথে অনেক সাদা চামড়াও পড়ে। এমনকি টিচাররাও অনেকে সাদা চামড়া। আমরা ছোট্ট স্টেশনারি শপ থেকে কেনাকাটা করতে লাগলাম। দোকানটা আমাদের আউয়ালের মত। আর লোকটা কোলকাতার। আমাদের পেয়ে বাংলাতেই কথা বলা শুরু করে দিলো। আমরা কম দামে লিড হোল্ডার, স্কেচ বুক এইসব জিনিসপত্র কিনে নিলাম।

খুব বেশিক্ষন আমরা ওখানে থাকলাম না। সেপ্ট থেকে অটোতে করে রওয়ানা দিলাম NID এর উদ্দেশ্যে। ঢুকে আমরা এদিক সেদিক ঘুরে বেড়ালাম। বিভিন্ন ওয়ার্কশপগুলো দেখলাম। তারপর দেখলাম ডিসপ্লে সেন্টার। সেখানে সব ডিপার্টমেন্টের কাজ ডিস্প্লে করা আছে। অটোমোবাইল ডিপার্টমেন্টের কাজ দেখে আমাদের ইশতিয়াকের মাথা খারাপ হয়ে গেলো। এমনিতেই ওর এইসব গাড়ি বিষয়ক ঝোঁক আছে, তার উপর কাবজাব মার্কা গাড়ির ডিজাইন দেখে ও মাথা নেড়ে বলতে লাগলো, ‘আমি বুয়েট ছেড়ে এইখানে চলে আসবো……’ । এইখানকার স্পেস গুলোও অনেক সুন্দর। একটা খুবই সুন্দর স্পাইরাল সিঁড়ি দেখে আমরা মুগ্ধ হলাম। ঘুরতে ঘুরতেই টের পেলাম বেলা হয়ে গেছে, কিছু খেয়ে নেওয়া প্রয়োজন। খুঁজে খুঁজে ক্যাফেটা বের করলাম। গাছ তলায় অনেকটা সেমি ওপেন জায়গায় কিছু কিছু স্ন্যাক্স বানানো হচ্ছে আর খোলা আকাশের নিচেই চেয়ার টেবিলে বসে অনেকে খেয়েদেয়ে নিচ্ছে। আর ইন্ডোর ক্যাফেতে অনেক লম্বা লাইন। অনেক চিন্তা ভাবনা করে তাড়াতাড়ি করার জন্য আমি.৪০ রুপির ভেজ পিৎজা অর্ডার দিলাম। লোকটা আমার সামনেই ধীরে সুস্থে একটা রুটি বানালো, তার উপর সস দিলো, কিছু পিয়াজ দিলো, তারপর আস্তে আস্তে চিজ কুচি কুচি করে ছড়িয়ে দিলো, সবশেষে জিনিসটা ওভেনে ঢুকিয়ে দিলো। আমি ধৈর্য ধরে অপেক্ষা করতে লাগলাম। ওভেনে টিং করে শব্দ হলো তারপর উনি আস্তে ধীরে পিৎজাটা বের করে আনলেন। তারপর আস্তে ধীরে সেটাকে কেটে টুকরা করে প্যাকেট করে আমার হাতে তুলে দিলেন। আমি অবাক হয়ে গেলাম, এত শত শত শিক্ষার্থীকে এই গতিতে খাবার দিয়ে কেমন করে তারা চলতে পারে? আর সবাই এতক্ষণ ধরে ধৈর্য ধরে দাঁড়িয়ে থাকে কেমন করে?

আমি প্যাকেটটা হাতে নিয়েই দৌড় দিলাম। গেটের সামনে সবাই আমার জন্য অপেক্ষা করেছে। গিয়ে দেখি অটো ঠিক করা হয়ে গেছে, আমি আসতেই সবাই ধুপধাপ উঠে পড়লাম। রওয়ানা দিলাম ক্রসওয়ার্ডের উদ্দেশ্যে। আমি অটোতে বসেই গপাগপ কামড় দিয়ে পিৎজাটা খেয়ে নিলাম। অল্পক্ষণের মধ্যেই আমরা ক্রসওয়ার্ড নেমে পড়লাম। উরে বাব্বাহ, বিশাল বইয়ের দুনিয়া! শুধু কি বই, গাদা গাদা স্টেশনারি দিয়ে ভরা জায়গাটা। আমরা সবাই বই ফেলে স্টেশনারির দিকে ছুটলাম। অনেক জিনিস আছে অনেক সুন্দর তবে সেটা সত্যিকারে তেমন কোন কাজে আসবে না। আমরা রঙ্গিন কলমের সেট খুঁজতে লাগলাম। বড়গুলো সব মনে হয় গতকাল যারা এসেছিলো তারা কিনে নিয়ে গেছে, আমরা তেমন কোন সেটই পেলাম না। অনেক কিছুই পছন্দ হচ্ছিলো কিন্তু দাম বেশি। এর মধ্যেও আমরা ট্রলি ঠেলে ঠেলে জিনিসপাতি দেখতে লাগলাম। রঙ পেন্সিল, পেস্টাল, রিডিং লাইট, লিড হোল্ডার, ইরেজার, কালার পেন- এইসব কেনা কাটা করেই আমরা তাড়াহুড়া করে বের হয়ে আসলাম। তাড়াতাড়ি করে আবার অটো ঠিক করে ছুটলাম IIMA এর উদ্দেশ্যে।

লুই কানের করা IIMA এর পুরানো ক্যাম্পাস
লুই কানের করা IIMA এর পুরানো ক্যাম্পাস

আইআইএমে এসে দেখলাম অনেকেই এসে পড়েছে। আমরা অপেক্ষা করতে লাগলাম বাকিদের জন্য। নিশাতকে দেখলাম ‘ক্যান্ডেল’ নামের একটা দোকান থেকে সুন্দর সুন্দর সব স্টেশনারি কিনেছে। দেখে মনে হলো, ক্রসওয়ার্ড না গিয়ে ক্যান্ডেল গেলেই মনে হয় ভালো হতো! সবাই চলে আসলে আমরা একসাথে ভিতরে ঢুকতে লাগলাম। আমাদের সাথে এই ইন্সটিটিউটের এক জন লোককে দেওয়া হলো সব ঘুরিয়ে ফিরিয়ে দেখিয়ে দেওয়ার জন্য। বিল্ডিংটা দূর থেকে দেখেই সবাই বুঝে ফেললাম, লুই কানের নকশা করা! আমাদের সংসদ ভবনের লাল ইটের কমপ্লেক্সগুলোর মত এই বিল্ডিংও বিশাল বিশাল আর্চ দেওয়া একেকটা লাল ইটের কম্পোজিশন। প্রায় একই সময় করা নাকি এই দুইটা ডিজাইন! আমরা বিশাল ক্যাম্পাস ঘুরে ফিরে দেখতে লাগলাম। কোন এক হিন্দি সিনেমা নাকি এখানে শুটিং করা হয়েছিলো। যারা যারা সেই সিনেমাটি দেখেছে তারা একেকটা জায়গা দেখে চিনতে পারলো আর আমাদের কাছে বলতে লাগলো দৃশ্যগুলোর কথা। অনেকক্ষণ হেঁটে হেঁটে আমরা পুরানো ক্যাম্পাস দেখা শেষ করে গেলাম নতুন ক্যাম্পাসের দিকে। নতুনটা তো আরও সুন্দর! কনক্রিট আর গ্লাস দিয়ে বানানো নতুন ক্যাম্পাসের সাথে পুরানোটার তেমন কোন মিল নাই বললেই চলে। দেখে কেমন যেন মনে হয় যে রফিক আজমের ডিজাইন! এই বিকাল বেলায় এখানে কোন ক্লাস-টাস নাই। তাই ছিমছাম জনমানব শূন্য ক্যাম্পাসে আমরা ঘুরে ফিরে বেড়াতে লাগলাম। সুন্দর গাছপালা, সবুজ ঘাস, সাথে খোলামেলা চকচকে ঝকঝকে হলগুলো দেখতে দেখতে আমাদের বুক থেকে দীর্ঘশ্বাস বের হয়ে আসলো, হায়- এরকম এক দুইটা ক্যাম্পাস যদি আমাদের দেশে থাকতো!  পুরো ক্যাম্পাস ঘুরেফিরে আমরা ফুরফুরা মেজাজে বের হয়ে আসলাম।

IIMA এর নতুন ক্যাম্পাস
চার্লস কোরেয়ার করা IIMA এর নতুন ক্যাম্পাস

এখান থেকে বের হয়ে দেখলাম অবনী আর তানভীর মিল ওনার্স এসোসিয়েশনে যাবে। আমিও ওদের সাথে জুটে গেলাম। তারপর আমরা একটা অটো নিয়ে রওয়ানা দিলাম আগের দিনের আশ্রম রোডে মিল ওনার্সের বিল্ডিঙের দিকে। পৌঁছাতেই দুঃসংবাদ পেলাম, দারোয়ান বললো অফিস বন্ধ- তাই ভিতরে ঢুকা যাবে না। আমরা তো মহা মুসিবতে পড়লাম। পরে অবনী আর তানভীর অনেক বুঝিয়ে সুঝিয়ে দারোয়ানকে রাজি করিয়ে ভিতরে ঢুকার ব্যবস্থা করলো। পুরো বিল্ডিং বন্ধ এর মধ্যে আমরা সিড়ি দিয়ে উপরে উঠলাম। লুই কানের নকশা করা বিল্ডিংটার এক পাশ মূলত কালো আর হলুদ আর অন্য পাশে অনেক রকম রঙ। শেষ বিকালের লালচে রোদে হলুদ একটা দেওয়ালের সামনে দাঁড়িয়ে আমরা ছবি তুললাম। আমরা ঠিক যখন বের হতে যাবো তখনই দেখলাম মায়িশা, নোভা ওরাও গেট দিয়ে ভিতরে ঢুকছে। ওদের সাথে দেখা করেই আমরা বের হয়ে পড়লাম। আশ্রম রোডেই আমরা ‘এগ ফাস্ট রেস্টুরেন্ট’ নামের একটা খাবার দোকানে থামলাম, কারণ তানভীর আর অবনী লাঞ্চ করে নাই। দোকানটার ইন্টেরিয়র খুবই সুন্দর। আর শুধুমাত্র ডিমের তৈরি খাবারই পাওয়া যায়। ওরা মজা করে খেলো। এরপর আমরা যাবো কাঙ্কারিয়া লেক।

আমরা একটা অটো ঠিক করলাম। অটোওয়ালা ভালো মানুষের মত বললো, ‘ মিটারে যা ভাড়া আসবে তাই দিবেন’। অটোতে যে মিটার আছে সেটা আমরা খেয়ালই করি নাই। ঠিক আছে, মিটারে যেতে যেহেতু রাজি হয়েছে, আমরা খুশি মনে উঠে পড়লাম। সূর্য ডুবতে ডুবতেই আমরা পৌঁছে গেলাম লেকের গেটে। অটোওয়ালা আমাদের ভাড়া জানালো ১৫০ রুপি। আমাদের আক্কেল গুড়ুম হয়ে গেলো শুনে। ১৫০ রুপি মানে! দশ পনের মিনিট লাগলো পৌঁছাতে আর ভাড়া ১৫০ রুপি কেমন করে হয়? অটো ওয়ালা বিরক্ত হয়ে আমাদের মিটারের রিডিং দেখিয়ে কি সব চার্ট থেকে কিলোমিটারের সাথে রুপি গুন দিয়ে হিসাব করে দেখাতে লাগলো যে ভাড়া ঠিকই আছে। তানভীর সব বুঝে গম্ভীর হয়ে বললো, ‘ হিসাব ঠিক আছে, অন্য কোনভাবে কারসাজি করেছে’। আমি গ্যাঞ্জামে জড়াতে চাইলাম না। অবনীকে বললাম দিয়ে দিতে যা ভাড়া চেয়েছে। কিন্তু অবনী বেঁকে বসলো, ‘মগের মুল্লুক নাকি’। অবনী ছুটে গেলো লেকের গেটে দাঁড়ানো দারোয়ানের কাছে। তাদের কাছে গিয়ে অবনী সব খুলে বললো। লোকগুলো হিন্দীতে বললো, ‘আপনারা ওঠার সময় মিটারে রিডিং জিরো দেখে উঠেন নাই?’ আমরা বললাম যে আমরা তো প্যাচঘোচ বুঝি নাই যে ভাড়ায় দুই নম্বরী করা যাবে। লোকগুলো তখন অটোওয়ালার সাথে কথা বললো। প্রথমে অটোওয়ালা বেশ শক্ত ছিলো। কিন্তু দারোওয়ানগুলো যখন ঝাড়ি মেরে উঠলো তখন সে মিনমিন করতে লাগলো। শেষমেশ ৭০ রুপিতে দফা রফা হলো। ভাড়া মিটিয়ে দিতেই ব্যাটা চোখের পলকে চলে গেলো। দারোয়ানগুলো আমাদের বললো যে সাধারনত কেউ মিটারে যেতে রাজি হয় না, আমরা বিদেশি টের পেয়েই ব্যাটা মামদোবাজী করতে চেয়েছিলো।  আমাদেরকে সাবধান করে দিলো পরেরবার যেন মিটারে জিরো দেখে অটোতে উঠি। ঝামেলা চুকে যাওয়ার পর আমরা আমরা যখন বললাম যে লেক দেখতে চাই তখন দারোয়ান আমাদেরকে জানালো যে সন্ধ্যার সময় লেক বন্ধ হয়ে যায়, রাতে ভিতরে কাউকে ঢুকতে দেওয়া হয় না। আমরা অনেক বোঝালাম যে একবার দেখে যেতে চাই লেকটা। কিন্তু তারা কিছুতেই রাজি হলো না। আমরা শেষ পর্যন্ত গেটের ফাঁক দিয়ে তাকিয়ে লেকটা দেখলাম। গোল একটা লেক, মনে হলো আসেপাশের পার্কটা বেশ সুন্দর। শেষমেষ কি আর করা, আমরা আরও কিছুদূর হেঁটে আবার অটো নিলাম। এবার খুব সাবধানে কথাবার্তা বলে ভাড়া ঠিক করে নিলাম। এই অটোওয়ালা ঠিকভাবেই আমাদের হোটেলের কাছাকাছি নামিয়ে দিলো। বাকিটা পথ আমরা হেঁটেই চলে গেলাম।

হোটেলে ফিরেই সব ঠিকমত গুছিয়ে নিলাম। রাতের খাবার খেয়ে নেওয়া দরকার, কিন্তু আর কাউকে পাচ্ছিলাম না পার্টনার হিসেবে। শেষ পর্যন্ত একাই চলে গেলাম এক তলার সেই খাবার রেস্টুরেন্টে। দেখলাম একটা টেবিলে জুবায়ের বসে খাচ্ছে। সেই টেবিলে বসেই অর্ডার দিলাম টমেটু মাসালা আর পুরি। এত সুস্বাদু ছিলো খাবারটা যে আমি গোগ্রাসে খেতে লাগলাম। কিছুক্ষণ পর জুবায়ের খেয়ে উঠে চলে গেলো। আমি একা একা বসেই চেটেপুটে খেতে লাগলাম। খাওয়া শেষ করে বিল দিয়ে বের হয়ে আসতে যাবো, এমন সময় দেখলাম অনেকে ছোট ছোট প্যাকেটে পানি কিনছে। দুই রুপি করে একেকটা প্যাকেট। অনেকটা সাবানের প্যাকেটের সমান সাইজ। দেখে মজা লাগলো।

সব গুছিয়ে আমরা বেজমেন্ট থেকে আমাদের মালপত্র উপরে উঠাতে লাগলাম। টের পেলাম আমার সানগ্লাসটা খুঁজে পাচ্ছি না। মন খারাপ হয়ে গেলো। একটা সানগ্লাস অলরেডি হারিয়েছি, এই দুই নম্বরটাও যদি হারায় তাহলে ……। এমন সময় নিশাত এসে সানগ্লাসটা দিয়ে বললো, ‘আমাদের রুমে ফেলে গিয়েছিস’। মনে মনে বলে উঠলাম, ‘আলহামদুলিল্লাহ’। আমরা হোটেলের সামনে ছেচল্লিশ জন দুনিয়ার লাগেজ নিয়ে অপেক্ষা করছি গোয়েলের জন্য। কিন্তু গোয়েল আর আসে না। ওদিকে রাস্তাঘাট, হোটেল আর আশেপাশের সব লোকজন আমাদের দিকে অবাক হয়ে তাকিয়ে রইলো, এত মানুষ- এত লাগেজ……। অবশেষে গোয়েল আসলো। আমরা ঝাঁপাঝাপি করে উঠে বসলাম। কমিটির লোকজন ধৈর্য নিয়ে লাগেজ ওঠা তদারকি করতে লাগলো। প্রায় ১০টার দিকে আমরা রওয়ানা দিলাম। এবারে আমাদের গন্তব্য আওরঙ্গবাদ।

আমি চুপচাপ ভাবতে লাগলাম আহমেদাবাদের কথা। এখানকার রান্না খুবই মজার আর অ-নে-ক সস্তা। বিআরটিএস বাস সার্ভিসটা মেইন হলেও সব সময় বাসে করে সব জায়গায় যাওয়া যায় না। অটোই ভরসা কিন্তু অটোওয়ালাগুলো সবচেয়ে খারাপ। এই কয় দিনের মধ্যে সবচেয়ে খারাপ অটোওয়ালাদের সাথে দেখা হওয়ার অভিজ্ঞতা হয়েছে আমার। তবে সাধারন মানুষগুলো ভালোই। বেশভূষা আমাদের দেশের মানুষদের মতন। সব মিলিয়ে মনে হলো শুধু খাওয়াদাওয়ার জন্যই আরেকবার আহমেদাবাদ আসলে মন্দ হয় না।

সারা দিনের ঘোরাঘুরির পর ক্লান্ত হয়ে আমি চোখ বন্ধ করলাম। বিশাল জার্নি করতে হবে আমাদের। প্রায় চৌদ্দ ঘন্টা। এখন চোখ বন্ধ করে বিশ্রাম নেওয়া দরকার। সলিড বিশ্রাম।