The Mighty INDIA CALLING: অ্যাডভেঞ্চারের নাম ‘প্যারাসেইলিং’ এবং ট্রেন ধরার টেনশন (পর্ব ৩০)

পরদিন সকালে ঘুম ভাংলো মজুমদারের কান্নাকাটিতে। মোবাইলটা হারিয়ে যাওয়ার শোকটা এখনও ভুলতে পারছে না ও। তাড়াতাড়ি করে রেডি হয়ে বের হয়ে পড়লাম। আমাদের সবার ইচ্ছা ওল্ড গোয়ায় একবার যাওয়ার। আমি, রুবাইদা, মিম আর অন্তরা মিলে হাঁটা দিলাম মেইন রাস্তার দিকে। ডক্টর আলফনসো রোডের মোড়ে বেশ কয়েকটা ট্যাক্সি দাঁড়িয়ে ছিলো। আমাদের দেখে এগিয়ে আসলো। ওল্ড গোয়ায় যাবো শুনে সবাই খুব আগ্রহ দেখালো। কিন্তু দাম চাইলো আকাশ্চুম্বী। সব চেয়ে কম যেটা চাইলো সেটাই ছিলো ১০০০ রুপি। ট্যাক্সি ভাড়া শুনে আর সময় হিসাব করে আমরা সিদ্ধান্ত নিলাম যে ওল্ড গোয়ায় আর যাওয়া যাবে না। এতে রুবাইদার মন খারাপ হলো সবচেয়ে বেশি। আমরা আবার হেটে হেটে হোটেলের দিকে যেতে লাগলাম।

নাশতা করার জন্য কোন চিন্তা ভাবনা না করেই ভিন্সিস প্লেসে ঢুকে আগের দিনের ব্রেড অমলেট আর সাথে সি ফুড সুপ অর্ডার দিয়ে দিলাম। পেট ভরে নাশতাটাই এত মজা করে খেলাম যে মনে হলো হাঁটাহাঁটি করা প্রয়োজন। ওদিকে সবাইকে দেখছিলাম প্যারাসেইলিং এ যাওয়ার কথাবার্তা বলছে। আমরাও যোগ দিলাম এতে। খাওয়াদাওয়া শেষে বের হয়ে পড়লাম আমরা। প্রথমে গেলাম কাছের কালাঙ্গুটে বিচে। সেখান থেকে হাঁটা ধরলাম বাগা বিচের উদ্দেশ্যে। বাগা বিচে পৌঁছানোর আগেই শুভ, রাজিব, নিলয়কে দেখলাম এক দোকানের সাথে কন্ট্রাক্ট করতে প্যারাসেইলিং এর জন্য। নরমালটা ৬০০ রুপি আর Deep Sea নিলে ৮০০ রুপি। আমরা সবাই নরমালটা নিলাম ৬০০ রুপি দিয়ে। এমনিতেই সাঁতার পারি না, তার উপর Deep Sea, কোন দরকার নাই বাবা!

আমি, নিশাত, পৃথ্বী, রিন্তু, মজুমদার, রুবাইদা, নিলয়, রাজিব, তুষার, শুভ আমরা সবাই মিলে এক সাথে লাইন ধরলাম বোটের জন্য। সেখানে আমাদের বাংলা কথা বলতে দেখে বোটের একজন লোক এগিয়ে আসলো। জানালো তার বাড়ি বরিশাল। এখানেই প্যারাসেইলিংয়ের কাজ করে। বাড়ি যাওয়া হয় না অনেক বছর। আমাদের দেখে বললো, ‘দেশের মানুষ পেয়ে খুব ভালো লাগছে’। আমাদের কয়েকজনকে উনি আশ্বস্ত করলেন যে গোয়ার নাবিকরা অনেক দক্ষ। তাই যত বিপদজনক রাইডই হোক না কেন পর্যটকদের কোন বিপদ হওয়ার আশংকা খুবই কম। একটা স্পিড বোট এসে থামলো। আমরা টকাটক উঠে পড়লাম সেই বোটে। বোট আমাদের নিয়ে ছুটলো সৈকত থেকে দূরে।

বড় বড় ঢেউয়ের ঝাকুনি খেয়ে আমরা গিয়ে থামলাম আরেকটা বোটের পাশে। এই বোটটা বড়। আমরা সবাই গিয়ে উঠলাম সেই বোটে। আমাদের নামিয়ে দিয়ে স্পিড বোট চলে গেলো। আমাদের সবাইকে লাইফ জ্যাকেট পরতে বলা হলো। আমরা সবাই গলা ঢুকিয়ে দিলাম লাইফ জ্যাকেটের ফোকড়ে। আমাদের সামনেই দুজন লোক মিলে রঙ্গিন প্যারাসুট বের করলো। তারপর সেটা কপিকলের সাথে ঠিকমত বাঁধাছাদা করতে লাগলো। তারপর ছেড়ে দিতেই ফুলে ফেঁপে সেটা একটা বিশাল রঙ্গিন বেলুনের আকার ধারন করলো। সব দড়িটড়ি ঠিক ঠাকমত চেক করে লোকগুলো তারপর আমাদের দিকে তাকালো। সবার আগে নিলয় এগিয়ে গেলো। নিলয়কে কপিকলের কোথায় জানি আটকে দিলো। যেই বোটটাকে চালাতে লাগলো আর ওমনি নিলয় সাঁ করে উড়ে গেলো। ঠিক উড়ে চলে গেলো না, দড়ি দিয়ে বাঁধা অবস্থায় বোটের উপর ভাসতে লাগলো। আমরা নিচ থেকে হাঁ করে দেখতে লাগলাম। ঠিক কয়েক সেকেন্ডের মধ্যেই নিলয় আবার নেমে আসলো। তারপর ঠিক একইভাবে পৃথ্বী, নিশাত আর মজুমদার উড়ে গেলো কয়েক সেকেন্ডের জন্য। আমরা নিজেরা একবার ‘ডিপ সি’র কথা বলাবলি করছিলাম, তখন মোটা লোকটা জোরে জোরে আমাদের আশ্বস্ত করতে লাগলো, ‘ কোয়ি রিস্ক নেহি, বিল্কুল সেফ হ্যায়, সুইমিং কি কোয়ি জরুরাত নেহি, বহত আচ্ছা হ্যায়’। রাজিবের পালা আসতেই রাজিব ২০০ রুপি হাতে নিয়ে চালক সেই মোটা লোকটার হাতে গুঁজে দিয়ে বললো, ‘ডিপ সি’। লোকটাও মাথা নেড়ে রাজি হয়ে গেলো। তারপর আমরা দেখতে লাগলাম, একইভাবে রাজিবও উড়ে গেলো। উড়ে যেতেই লাগলো অনেক দূর। তারপর প্রচন্ড বেগে ছুটতে ছুটতে আস্তে আস্তে নিচে নামতে লাগলো। নামতে নামতে অর্ধেক ওর ডুবে গেলো পানিতে। তারপর আবার কিছুটা উঠে গেলো উপরে। তারপর একইভাবে আবার নামতে লাগলো পানিতে। ওই অবস্থায় রাজিবকে দেখে আমরা যারা বাকি ছিলাম সবাই পকেট থেকে ২০০ রুপি বের করে হাতে নিয়ে বসে থাকলাম। কেউ আর নরমালটা করতে রাজি না, সবাই ডিপ সি করতে চায়। আমি মনে মনে হাসলাম, এটা তাহলে Deep Sea না হয়ে হবে Dip Sea।

অর্ধেক মানুষের হয়ে গেলে আগের সেই স্পিড বোট নতুন প্যাসেঞ্জার নিয়ে আসলো। যাদের যাদের হয়ে গেছে তারা নেমে গেলো, আর নতুন প্যাসেঞ্জাররা আমাদের সাথে বোটে উঠে আসলো। এক দল ছেলেমেয়ে, আমাদের সমানই হবে হয়তো বয়স। আর আমরাও একেকজনকে পানিতে নাকানি চুবানি খেতে দেখছিলাম আনন্দ নিয়ে। আমার পালা যখন এলো আমি উঠে দাঁড়ালাম। কপিকলটার সামনে দাঁড়াতেই কয়েকটা জয়েন্ট লক করে আমাকে একবার জিজ্ঞেস করলো, ‘রেডি?’ । আমি মাথা নাড়তেই প্যারাসুটটার প্রচন্ড টানে আমি উঠে গেলাম উপরে। প্রায় চল্লিশ থেকে পঞ্চাশ ফিট উপরে উঠে যাওয়ার পর আমার মনে হলো আমার পায়ের নিচে সারা পৃথিবীটা স্তব্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। অবাক হয়ে নিচে তাকিয়ে দেখতে লাগলাম নিশ্চুপ, শান্ত বিশাল নীলচে সবুজ রঙের সমুদ্রকে। অনেক দূরে একপাশে দেখা যাচ্ছে বিচের দিগন্ত রেখা। আর অন্য সব পাশেই শুধুই সমুদ্র। দূরে দূরে আরও কয়েকটা বোট থেকে আমার মতন আরও কয়েকজন আকাশে ভেসে আছে, তাদের ছায়া দেখতে পাচ্ছিলাম। টলটলে কাঁচের মতন পানি। সেখানে দেখা যাচ্ছে ছোট্ট বোটটাকে যার পাশে আমার প্যারাসুট আর আমার ছায়া পড়েছে বিশাল জায়গা জুড়ে। আমি সাবধানে পা নাড়িয়ে দেখলাম, বিশাল ছায়াটার বিশাল বিশাল পা দুটো নড়ছে। মনের মধ্যে এক অদ্ভূত আনন্দের অনুভূতি হলো। একবার মনে হলো চিৎকার করে সবাইকে জানিয়ে দেই মনের আনন্দটার কথা। কিন্তু কাকে বলবো? কে শুনবে? এই উচ্চতায় তো আমি একা। এই নিস্তব্ধ পৃথিবীটার দিকে যেন আমি একা তাকিয়ে আছি। কতক্ষন হবে- কয়েক সেকেন্ড? বড়জোড় এক মিনিট? কিন্তু আমার কাছে  মনে  হয়েছিলো যেন পৃথিবীটা থেমে গেছে কয়েক মুহুর্তের জন্য।

একটু পরেই টান অনুভব করলাম। আমাকে নিয়ে প্যারাসুট নিচে নামতে লাগলো। সোজা পানির উপরে। প্রচন্ড বেগে ছুটতে ছুটতে আমি পানি স্পর্শ করলাম। আস্তে আস্তে আমার শরীরের প্রায় অর্ধেক পানিতে ডুবে গেলো। সেই অবস্থায় স্পিড বোটের সাথে পাল্লা দিয়ে আমি প্রায় সমান তালে পানির মধ্যে দিয়ে ছুটতে লাগলাম। ব্যাপারটা যে কত মজার সেটা যে না করবে তাকে কোনদিনই বোঝানো সম্ভব না। আমাকে একবার পানির উপর তুলে কয়েক সেকেন্ড পর আবার ডুবানো হলো। আমি সেই অবস্থায় দাঁত বের করে হাসতে লাগলাম। নিশাত সবার প্যারাসেইলিংয়ের দৃশ্য ভিডিও করেছে। আমার সেই দাঁত বের করা হাসির দৃশ্যো ওর ক্যামেরায় বন্দি হয়ে রইলো। এরপর আমাকে সোজা উপরে উঠিয়ে আবার টেনে বোটে নিয়ে নামালো। আমি নামতেই লোকগুলো আমার বাঁধন খুলে দিলো। সব মিলিয়ে হয় তো আড়াই মিনিট হবে। আড়াই মিনিটের অভিজ্ঞতায় আমি ফুরফুরে আনন্দের অনুভূতি নিয়ে বসে পড়লাম অন্য সবার সাথে। আমার পর তুষার বাকি ছিলো। ওকে রাখলো সবচেয়ে বেশিক্ষণ। ওকে ডুবালো সব মিলিয়ে চারবার। একবার তো বলতে গেলে পুরাই ডুবিয়ে ফেললো!

সদ
রঙ্গিন প্যারাসুট নিয়ে পানিতে নাকানি চোবানি

আমাদের সবার হয়ে গেলে আমরা স্পিড বোটের জন্য অপেক্ষা করতে লাগলাম। ততক্ষণে অন্য যেই দলটা এসেছে তাদেরকে উঠানো হতে লাগলো। ওরাও আমাদের মত নরমাল টিকেট কেটেছে। প্রথম একজন কয়েক সেকেন্ড ভেসে থাকার পর ওদের একজন চ্যাঁচামেচি করতে লাগলো যে আমাদের বেশি সময় রাখা হয়েছে আর ওদের কমসময় রাখা হচ্ছে। স্টেয়ারিং হুইলে থাকা মোটা লোকটা তখন রেগে গেলো। সেই লোকটাও পালটা চিৎকার করে বলতে লাগলো যে আমরা ‘ডিপ সি’র টিকেট কেটে এনেছিলাম তাই আমাদের বেশি সময় রাখা হয়েছে। ওরাও তখন ডিপ সির জন্য বাড়তি টাকা দিতে চাইলো কিন্তু লোকটা তাদের সরাসরি না করে দিলো। সাফ জানিয়ে দিলো, টিকেট ছাড়া কাউকেই বাড়তি কিছু দেওয়া হবে না। ওরা কিছু বলতে না পেরে মুখ গোঁজ করে বসে রইলো। আর আমরা একজন আরেকজনের দিকে দৃষ্টি বিনিময় করে মিটিমিটি হাসতে লাগলাম। আমাদের সময় উনিই সবচেয়ে বেশি উৎসাহ দিয়েছিলেন, আর এখন উনিই কড়াভাবে না করে দিলেন!

স্পিড বোট আসলে আমরা উঠে পড়লাম। বোট আমাদের তীরে নিয়ে নামিয়ে দিলো। আমাদের অনেকে অন্যান্য রাইডের প্রতি আগ্রহ প্রকাশ করলো। জাফররা মনে হয় ব্যানানা রাইডে উঠার প্রিপারেশন নিলো। আমার আর কোন কিছুর প্রতি আকর্ষণ ছিলো না। আমরা কয়েকজন হেঁটে হেঁটে কালাঙ্গুটের দিকে যেতে লাগলাম। আমি আর রিন্তু পাশাপাশি হাঁটছিলাম। ফস করে কে যেন পাশ থেকে বলে উঠলো, ‘আয়সি কাপড়ে পেহেনকার ইয়াহা কোয়ি আতাহে?’। আমি শুনি নাই, কিন্তু রিন্তু শুনে ফেললো। এই বিচের মধ্যে হিজাব পরা লোকজন হয়তো খুব একটা দেখা যায় না, তাই আমাদের দেখে মন্তব্যকারীর মত অনেকেই হয়তো বেশ অবাক হয়েছে। আমি আর রিন্তু একজন অন্যজনের দিকে তাকিয়ে হাসলাম।

আজকেই আমাদের গোয়ায় শেষদিন। বিকালেই গোয়া ছেড়ে চলে যাবো। তাই শেষবারের মত কালাঙ্গুটে বিচে এসে পানির উপর বসলাম আমি আর তমা। মিম, অন্তরা আর রিন্তু হোটেলে ফিরে গেলো। ওদের গোসল করে বের হতে সময় লাগবে। তাই এই মুহুর্তে আমার হোটেলে ফিরে গিয়ে লাভ নাই। রুবাইদা, আমি আর তমা বেশ আয়েশ করেই পানিতে বসলাম। তারপর আমি আর তমা গল্প করতে লাগলাম। লোনা পানির ঢেউয়ের ঝাপ্টায় আমাদের গল্পে মাঝে মাঝে ছেদ পড়তে লাগলো। আমরা তাল সামলে আবার ঠিক হয়ে বসে গল্প করতে লাগলাম। প্যারাসেইলিং করবো বলে মোবাইল কিংবা ঘড়ি কোনটাই নিয়ে বের হই নাই। তাই কেউ ফোন করারও নাই, বা ঘড়িতে সময় দেখারও উপায় নাই। দুপুরের গনগনে সূর্যের তাপকে আমরা পাত্তাই দিলাম না। বিশাল সমুদ্রের তীরে বসে সব চিন্তা বাদ দিয়ে লোনা পানির ঢেউয়ে বসে বসে নিশ্চিন্ত মনে গল্প করতে লাগলাম আমরা। যখন মনে হলো অনেক সময় পার হয়ে গেছে, তখন আমরা তিনজন উঠে পড়লাম। শেষবারের মত বিদায় জানালাম ভুমধ্যসাগরকে। বিচ ছেড়ে হাঁটতে শুরু করলাম হোটেলের দিকে।

রুমে পৌঁছে দেখি ওদের গোসল প্রায় শেষ। আমি ঢুকে পড়লাম গোসল করার জন্য। ততক্ষণে বাথরুমে বালির এক বিশাল পাহাড় তৈরি হয়েছে। যতই পানিঢালা হোক না কেন সেই বালি কিছুতেই সরে না। আমার গোসল শেষে জামাকাপড় ধোয়ার পর সেই পাহাড় আরও বড় হয়ে গেলো। গোসল শেষে বের হয়ে দেখি রিন্তু চলে গেছে। ওদের সাথে ক্যাফে মোকায় যাওয়ার কথা ছিলো। কিন্তু কি আর করা, আমার দেরি হয়ে গেছে। আমি তাড়াতাড়ি তমাদের বাড়ির দিকে হাঁটা ধরলাম। তমা, রিজভী আর আফরা বের হয়ে আসলো। ওরাও ক্যাফে মোকাতেই যাবে। আমি ওদের সাথে জুটে গেলাম। কিন্তু কমিটির লোকজন বার বার বলতে লাগলো ঠিক ঠিক চারটার সময় আমরা রওয়ানা দিয়ে দিবো। যে করেই হোক তার আগেই এসে বসে থাকতে হবে। আমরা বের হয়ে অটো ঠিক করতে গেলাম। কিন্তু অটোওয়ালা রাজি হলো না। আমরাও সময় হিসাব করে দেখলাম গিয়ে ফেরত আসা সম্ভব হবে না। তাই কি আর করা, মোকাতে না যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়ে নিলাম আমরা। দুপুরে খাওয়ার জন্য ঢুকলাম ‘বৃন্দাবন হোটেল’ এ।

বেশ বড় খোলামেলা হোটেল। আমরা বসার সাথেসাথেই মেনু নিয়ে আসলো একজন লোক। আমি অর্ডার দিলাম প্রন হাক্কা নুডুলস আর ব্যানানা শেক। কিছুক্ষনের মধ্যেই বড় বড় চিংড়ি দেওয়া মজাদার নুডুলস এসে হাজির হলো। আমরা সবাই গোগ্রাসে খাওয়া শুরু করলাম। সবার খাওয়ার পরিমান এত বেশি ছিলো যে খেয়ে কিছুতেই শেষ করা গেলো না। খাওয়াদাওয়া শেষ করে আমি আর তমা বের হয়ে পড়লাম বাদাম কেনার জন্য। তমা বাদাম কিনতে চায়, কিন্তু কয়েকটা দোকানে বাদামের অস্বাভাবিক দাম দেখে ও না কেনার সিদ্ধান্ত নিলো। একটা আইসক্রিমওয়ালার কাছ থেকে ‘ভাদিলালাল’ এর একটা চকোবার কিনলো তমা। আমি খেয়াল করলাম লোকটা নিজেই আইস্ক্রিমের প্যাকেটটা ছিড়ে আইসক্রিম বের করে তমার হাতে দিলো। পরে তমা খেতে খেতে বললো আইস্ক্রিমটা একটু অন্যরকম। আমি বললাম- এটা দুই নম্বুরি ভাদিলাল। কারণ আমাদের প্যাকেট দেখতে দেয় নাই। ব্যাটা নিজেই ফেলে দিয়েছে। তমাও মনে হয় ব্যাপারটা বুঝতে পারলো। দুঃখি দুঃখি মনে তমা আইসক্রিম খেতে লাগলো।

হোটেলে ফেরার পথেই রুবাইদার সাথে দেখা। ও ১০০-১৫০ রুপি দিয়ে স্কার্ফ কিনেছে। আমাকে দেখানোর জন্য ঐ দোকানে নিয়ে গেলো ও। আমার তেমন পছন্দ হলো না। আমরা সেই দোকান থেকে বের হয়ে হোটেলের দিকে যেতে লাগলাম। হোটেলের সামনে গিয়ে দেখি সারি সারি বড় বড় মাইক্রো দাঁড়ানো। এইগুলোতে করে আমরা রেলস্টেশন যাবো। সেগুলোতে আমাদের লোকজন উঠে মালপত্র টানাটানি করে ঢুকাচ্ছে। কি সর্বনাশ, সবাই গাড়িতে উঠে গেছে! আমি আর রুবাইদা দৌড় দিলাম। দৌড়াতে দৌড়াতে সিড়ি দিয়ে দোতলায় উঠে বারান্দায় শুকাতে দেওয়া কাপড়গুলো একটানে নিয়ে লাগেজে ভরে লাগেজ টানতে টানতে নেমে পড়লাম। আবার সেই সিড়ি দিয়ে লাগেজ নামিয়ে কাঁচা রাস্তার উপর দিয়ে টেনে টেনে মাইক্রোর সামনে এসে দাঁড়ালাম। এদিক সেদিক তাকিয়ে দেখি সব গাড়িই ভর্তি। কোনটাই খালি নাই। আমি রুবাইদা আর তুষার আমরা তিনজন লাগেজ নিয়ে দাঁড়িয়ে আছি রাস্তায়। কোন গাড়িতে উঠতে পারছি না। শুনলাম আরও একটা গাড়ি নাকি আসবে। সেটাতে আমরা উঠবো।

ওই দিকে জুবায়ের একটা গাড়ির সামনে বসে জানালো তুষারকে কোনমতে উঠে পড়ার জন্য সেই গাড়িতে। কিন্তু ভিতর থেকে সবাই বলতে লাগলো আমাকে উঠে পড়তে। জুবায়ে বললো, ‘লাগেজের জায়গা হবে না কিন্তু’।  রুবাইদা আর তুষার আমাকে বললো লাগেজ ছাড়াই উঠে পড়তে। আমি কোন মতে উঠে পড়লাম। ভেতরে এক অদ্ভূত দৃশ্য! পুরো গাড়িটা মানুষ আর লাগেজে এমনভাবে পরিপূর্ণ যে কোন নড়াচড়ার জায়গা নেই। ভেতরে ঢুকতেও আমাকে বেশ বেগ পেতে হলো। সৌভাগ্যক্রমে আমি অন্তরার পাশে এক চিলতে বসার জায়গা পেয়ে গেলাম। আমি বসার পর মনে হলো, আমার লাগেজটাও মনে হয় কোনমতে এটে যাবে। আমি সেকথা বলতেই বাইরে থেকে তুষার আমার লাগেজটা ঠেলে ভিতরে ঢুকিয়ে দিলো। কিন্তু ভারি লাগেজটা আমি ধরে রাখতে পারছিলাম না। হাত থেকে ফস্কে যাচ্ছিলো। এগিয়ে এলো রিন্তু, ফাহাদ, ইশতিয়াক আর শুভ। সবাই মিলে হ্যাঁচকা টান দিয়ে হাতবদল করতে করতে লাগেজটাকে একদম পিছে পাঠিয়ে দিলো। এক চিলতে জায়গায় কোলের উপর ব্যাকপ্যাকটাকে নিয়েই বসলাম। অ্যাট লিস্ট গাড়িতে উঠার জায়গা পেয়েছি, এটাই বা কম কিসে?

বাইরে থেকে আমাদের হোটেলের একজন লোক উসখুস করতে লাগলো, কেন আমরা রওয়ানা দিচ্ছি না। উনিই বললো আরেকটা গাড়ি এসে যাবে, এখন যেই গাড়িগুলো আছে সেইগুলো রওয়ানা দিয়ে দেওয়া দরকার। যেতে নাকি অনেক সময় লাগবে। ওনার তাড়াহুড়া দেখে কমিটি নির্দেশ দিলো রওয়ানা দেওয়ার। একটা একটা করে গাড়ি চলতে শুরু করলো। আমরা দেখলাম, সৌরভ, তুষার আর রুবাইদা বেশ কিছু মালপত্র নিয়ে রাস্তায় দাঁড়িয়ে আছে। ওরা অপেক্ষা করতে লাগলো ওদের গাড়ির জন্য। আর ওদের ফেলেই আমরা রওয়ানা দিলাম।

আমাদের ড্রাইভার জিজ্ঞেস করলো আমাদের ট্রেন কয়টায়। সাড়ে ছয়টায় ট্রেন শুনে ড্রাইভার অবাক হয়ে হিন্দিতে বললো, ‘এত দেরিতে কেন রওয়ানা দিয়েছেন? আপনারা তো পৌঁছাতে পারবেন না’। হোটেলের লোক আমাদেরকে স্টেশন এক দেড় ঘন্টার পথ বলেছে- এই কথা শুনে সে বললো, ‘সে তো অন্যসব দিনের জন্য, কিন্তু আজকে তো ভ্যালেন্টাইন ডে- আজকের জন্য তো আলাদা হিসাব’। এই বলে ড্রাইভার বেশ তাড়াহুড়া করে চালাতে লাগলো। জুবায়ের বারবার ওনাকে আস্তে ধীরে চালাতে বললো। কিন্তু ঊনার মুখে একটাই কথা, ‘আপনারা তো পৌঁছাতে পারবেন না’। বারবার একই কথা বলা আমরা একটু ভয় পেয়ে গেলাম।

মোটামুটি ফাঁকা রাস্তা দিয়েই আমাদের গাড়ি চলতে লাগলো। একটা হাইওয়েতে উঠে টের পেলাম ‘ভ্যালেন্টিন ডে’র মাহাত্ম। পুরো হাইওয়ে জ্যাম। বিশাল হাইওয়ে জুড়ে হাজার হাজার গাড়ি থমকে বসে আছে। কেউ নড়াচড়া  করছে না। শুনলাম সামনে নাকি কি এক কার্নিভাল আছে ভ্যালেন্টাইন ডে উপলক্ষে- সেই জন্য এত জ্যাম। বেশ খানিক্ষণ জ্যামে বসে থেকে আমরা ছটফট করতে লাগলাম। ঘড়ির কাঁটা এগিয়ে যেতে লাগলো, কিন্তু আমরা থেমেই রইলাম। গাড়ির পিছনে ততক্ষণে নানা আলোচনা শুরু হয়ে গেছে। শুভ বলছে যে ট্রেন যখন মিস করবোই তখন আর সামনে গিয়ে লাভ কি, ব্যাক করে গোয়াতে ফিরে গেলেই হয়। আবার রিন্তু বলতে লাগলো, ট্রেন পাই আর না পাই, স্টেশন পর্যন্ত যেতে তো আর অসুবিধা নাই। ইশতিয়াক বলতে লাগলো, অত রাত করে স্টেশনে পৌঁছে ব্যাক করার সুযোগ পাবো না, তারচেয়ে সময় থাকতে থাকতে ব্যাক করে ফেলা ভালো। শুভ ওইদিকে বসে বসে ‘প্ল্যান বি’ চিন্তা করতে লাগলো। ট্যুর প্ল্যান থেকে সাউথের পার্টটা বাদ দিয়ে কাশ্মির কিংবা দার্জিলিং অ্যাড করলে কেমন হয় সেই নিয়ে জোর আলোচনা হতে লাগলো। সব শুনে আমাদের মনে হতে থাকে, আজকের দিনে দারুণ একটা ঘটনা ঘটবে। ট্যুর প্ল্যানটা বোধহয় এইবার লন্ডভন্ড হয়ে গেলো!

ওদের প্ল্যান বি মোটামুটি ফাইনাল হয়ে গেলো, রিন্তু আর ফাহাদ একটু পর পর ম্যাঁও ম্যাঁও ডাকতে লাগলো, জুবায়ের গাড়ি থেকে নেমে আশেপাশে ঘুরে বেড়াতে লাগলো- কিন্তু আমরা আর জ্যাম ছেড়ে বের হতে পারলাম না। মাঝে মাঝে একটু আধটু নড়াচড়া হয়, কিন্তু জ্যাম থেকে আর বের হতে পারি না। এরমধ্যেই মোটামুটি ৬টা বেজে গেলো। আমরা যখন শিওর যে পৌঁছানো সম্ভব নয়, তখন জুবায়ের জানালো ট্রেন ডিলে করেছে এক ঘন্টা। আমরা খুশি হয়ে গেলাম, কিন্তু ড্রাইভার আগের মতই বলতে লাগলো, ‘লাভ নাই, ট্রেন মিস করবেন’। এক সময় আমাদের কথার সব স্টক শেষ হয়ে গেলো। আমরা ক্লান্ত হয়ে চুপ হয়ে গেলাম। সূর্য ডুবে গেলো। আমাদের মাইক্রো একটু একটু করে এগিয়ে যেতে লাগলো। রাত হয়ে গেলে আমাদের গাড়ি একটু ফাঁকা রাস্তা পেয়ে গেলো। ড্রাইভার প্রাণপণে গাড়ি চালাতে লাগলো।

আমরা যখন মারগাও স্টেশনে পৌঁছাই তখন আরও দুইটা গাড়ি এসে পড়েছে। আমরা তিন গাড়ির লোকজন দ্রুত গতিতে মালপত্র নামাতে লাগলাম। লাগেজটা হাতে নিয়ে দৌড়াতে দৌড়াতে স্টেশনে ঢুকে পড়লাম আমরা। হাঁপাতে হাঁপাতে যখন ওয়েটিং রুমে পৌঁছালাম তখন বাজে রাত পৌঁনে আটটা। সেখানে ঢুকে খবর পেলাম ট্রেন আরও এক দফা ডিলে হয়ে আসার টাইম হয়েছে রাত পৌনে দশটা। আমরা বুকের ভিতর আটকে থাকা নিশ্বাস ছাড়লাম। যাক বাবা, বাঁচা গেলো! আগের মত আমরা আমাদের মালপত্র বাঁধাছাঁদা করে বিশাল স্তুপ করে রাখলাম। আমার মোবাইলে রিচার্জ করা দরকার। আমি আর চিং খুঁজতে বের হলাম রিচার্জ করার দোকান।

অদ্ভূত ব্যাপার হলো রিচার্জ খুঁজতে খুঁজতে আমরা একটা ওভারব্রিজ পার হয়ে স্টেশন থেকে বের হয়ে পড়লাম। তাও কোন দোকান খুঁজে পেলাম না। এত্ত বড় স্টেশনে কোন মোবাইল রিচার্জের দোকান নাই, কি আজব! খুঁজতে খুঁজতে এক সময় যখন বুঝলাম কোন লাভ নাই, তখন আমি আর চিং ব্যাক করলাম। আমাদের দুজনের পায়েই স্পঞ্জের স্যান্ডেল- সেটা নিয়ে আমরা বেশ হাসাহাসি করলাম। স্টেশনের ভিতরে একটা দোকান থেকে আমি পানি আর বিশাল একটা স্যান্ডউইচ কিনে নিলাম। আপাতত এটাই আমার রাতের খাবার। এইসব নিয়ে আবার ওয়েটিং রুমে ফেরত গেলাম। সেখানে বসে খাওয়াদাওয়া করে নিলাম। তারপর গেলাম ‘সুলভ শৌচালয়’ এ। একেবারে দাঁতটাত মেজে ফ্রেশ হয়ে বের হলাম।

আগেরবারের মত এবার আর আমরা ভুল করলাম না। সাড়ে নয়টা বাজতেই আমরা ব্যাগপত্র নিয়ে প্ল্যাটফর্মে গিয়ে দাঁড়ালাম। আমি, উর্মি, চিং আর নিলয় ছাড়া বাকি ৪২ জনের সিট পড়েছে এক বগিতে। আমরা চারজন শুধু আলাদা বগিতে। ওরা ৪২ জন ওদের বগির নম্বর লিখা প্ল্যাটফর্মে গিয়ে দাঁড়ালো। ট্রেন নাকি থামবে কয়েক মিনিটের জন্য। এরমধ্যে সব মালপত্র নিয়ে এতজন মানুষের ট্রেনে ওঠা একটা বিশাল চ্যালেঞ্জ। তাই ওরা বুদ্ধি করে ২১ জনের দুইটা দলে ভাগ হয়ে গেলো। একদল ঢুকবে ডান পাশের দরজা দিয়ে, আরেকদল ঢুকবে বামপাশের দরজা দিয়ে। নিজেদের মধ্যে অনেক প্ল্যান প্রোগ্রামও হয়ে যাচ্ছিলো যে কিভাবে কে আগে উঠবে আর কিভাবে মালপত্র আর অন্যরা উঠবে। আর এদিকে আমরা চারজন খানিক দূরে প্ল্যাটফর্ম ১৮তে দাঁড়িয়ে আছি। আমরা খুব বেশি মানুষজন না, তাই আমাদের চিন্তাও কম। আমরা অধীর আগ্রহে ট্রেনের জন্য দাঁড়িয়ে রইলাম। উল্টাপাশের প্ল্যাটফর্মে একটা ট্রেন এসে থামলো। আমরা বাকিদের দিকে তাকাতে লাগলাম, ঐটা আমাদের ট্রেন নয়তো? দূর থেকে ওরাও ইশারা দিলো, না-ঐটা না। আমরা আবার অপেক্ষা করতে লাগলাম। এরমধ্যে একটা অদ্ভূত ট্রেন দেখলাম। এটা মালগাড়ি। তবে কন্টেনারের বদলে ট্রাক টানছে। মাল বোঝাই ট্রাকগুলোর ভিতরে ড্রাইভার আর হেল্পার বসে আছে। ট্রেনের ইঞ্জিন দিয়ে ট্রাক টেনে নেওয়ার ঘটনাটা আমি কখনও দেখি নাই। আমরা অবাক হয়ে দেখতে লাগলাম।

পৌনে দশটা বেজে পার হয়ে গেলো অথচ ট্রেন আসছে না দেখে আমরা চিন্তায় পড়ে গেলাম- কোন ভুল করলাম না তো?। এদিকে পুরো প্ল্যাট ফর্মে আমরা ছাড়া তেমন আর কোন মানুষজন নাই। এর মধ্যে কতগুলো কুকুর ঘাউঘাউ করতে লাগলো। একজন লম্বা মতন লোক কুকুরগুলোর থেকে দূরে সরে আমাদের কাছে এসে দাঁড়ালো। উনি উর্মিকে জিজ্ঞেস করতে লাগলো যে আমরা কই যাবো, কোথা থেকে এসেছে- এইসব। অন্য সবার মত আমাদের বিশদ কাহিনী শুনে লোকটাও বেশ অবাক হলো। লোকটা আমাদের নিশ্চিত করলো যে আমাদের ট্রেন এই জায়গাতেই আসবে। লোকটা নিজেকে একজন ইন্ডিয়ান আর্মি অফিসার হিসেবে পরিচয় দিলো। উনার কথাশুনে আমরা কিছুটা ভরসা পেলাম যে, ট্রেন আমাদের মিস হয় নাই!

অবশেষে রাত সাড়ে ১০টার দিকে ট্রেন আসলো। আমরা স্নায়ু টানটান করে দাঁড়িয়ে রইলাম। যেই ট্রেনটা থামলো সবার আগে আমি উঠে গেলাম দরজা দিয়ে। নিলয় নিচ থেকে টপাটপ আমাদের লাগেজগুলো তুলে দিতে লাগলো। আমরা সেগুলো টেনেটেনে ভিতরে ঢুকাতে লাগলাম। আমাদের তিনটা বড় লাগেজ ওঠানো হয়ে গেলে নিলয় উঠে পড়লো। সব মিলিয়ে মাত্র দশ থেকে পনের সেকেন্ড সময় লাগলো। আমরা একজন আরেকজনের দিকে তাকিয়ে হেসে ফেললাম। নিজেরদের কর্মে নিজেরাই মুগ্ধ হয়ে গেলাম। তারপর মালপত্র ঠেলে বগির ভিতরে ঢুকলাম। আমাদের সিট নম্বরগুলো পেয়ে গেলাম সহজেই। আমাদের খোপে একপাশে সবার উপরে নিলয়, তারপরেরটায় উর্মি আর সবচেয়ে নিচেরটায় আমি। আমার ঠিক উল্টো পাশে চিং। আমাদের বিশাল বিশাল লাগেজ ঢোকাতেই দুই সিটের মাঝখানের জায়গাটা ভরে গেলো। আগে তাও সিটের তলায় লাগেজ ঢুকেছিলো। এখন সব ফুলে ফেঁপে বড় হয়ে যাওয়ায় আমারটা ছাড়া আর কারওটা সিটের নিচে গেলো না। আমার লাগেজ আর সবার ব্যাকপ্যাকগুলো ঢুকানো হলো সিটের নিচে। নিলয়ের হ্যাভারস্যাক, উর্মি আর চিঙয়ের লাগেজটা রাখা হলো লাইন ধরে দুইসিটের মাঝখানে। আমাদের সব কিছু গোছগাছ করতে করতে ট্রেন ছেড়ে দিলো। একটু গুছিয়ে নিয়ে আমরা ফোন দিয়ে অন্যদের খবর নিলাম। ওরাও অন্য বগি থেকে আমাদের খবর নিলো আমরা ঠিক মত উঠেছি কিনা!

আমি একবার অন্য বগিতে সবার সাথে দেখা করে আসতে চাইলাম। কিন্তু কিছুদূর গিয়ে টের পাই মাঝে এক বগির দরজা সিল করে দেওয়া। তাই অন্যদের সাথে দেখা না করেই ফিরে আসি। এদিকে চিঙয়ের উপরের সিটটা একজন চমৎকার আংকেলের। উনি ব্যাগ গোছগাছ করতে আমাদের সাহায্য করলেন। ভদ্রলোক সাউথ ইন্ডিয়ান। হিন্দি বোঝেন না। অল্পবিস্তর ইংরেজি জানেন। তাই দিয়ে আমাদের সাথে কথা বলতে লাগলেন। আমাদের কাহিনী শুনে বেশ মজা পেলেন। চিং ওনাকে ইশারায় বললো যে ও রাতের খাবার খেয়েই মাঝের বাংকারটা মেলে দিবে। উনিও হাসিমুখে সায় দিলেন। কিন্তু কয়েক মিনিট পর ঘুমের চোটে ঝিমাতে লাগলেন। চিং তাড়াতাড়ি খেয়ে ওনার বাঙ্কারটা মেলে দিতেই উনি ঘুমিয়ে পড়লেন। আমি, নিলয় আর উর্মি কিছুক্ষণ কথা বার্তা বলে যার যার জায়গায় শুয়ে পড়লাম। শুয়ে পড়তেই ঘুম চলে আসলো। টের পেলাম প্রচন্ড গতিতে আমাদের নিয়ে ছুটে চলছে এই ট্রেন।

The Mighty INDIA CALLING: গোয়ার পথে ঘাটে সারাদিন ঘোরাঘুরি (পর্ব ২৯)

সকালে ঘুম ভাংলো একটু হৈ চৈয়ে। মজুমদারের ফোনটা খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না। ও সারা রুম তন্ন তন্ন করে খুঁজতে লাগলো। আমাদের সবাইকে জিজ্ঞেস তো করলোই, নিচে গিয়েও সবাইকে বলতে লাগলো ওর ফোনের কথা। ওর ফোনে আমাদের ট্যুরের গাদাখানেক ছবি আছে। ফোন হারিয়ে গেলে তো বেশ চিন্তার বিষয়। যাই হোক হাত মুখ ধুয়ে স্পঞ্জের স্যান্ডেলটা পায়ে গলিয়ে আমরা ফ্রেশ হয়ে নিচে নামলাম। সবাই একবার বিচে যাওয়ার প্ল্যান করলাম। সকালবেলার হাল্কা রোদে নিরিবিলি বিচে দাঁড়িয়ে আমরা সমুদ্র দেখতে লাগলাম। খুব ভালো লাগছিলো আমাদের। কিন্তু নাশতা করা হয় নাই। তাই আমরা বেশিক্ষণ থাকলাম না। আবার হোটেলের দিকে রওয়ানা দিলাম।

এদফ
সকালবেলা শান্ত সমুদ্রের পাশে (কৃতজ্ঞতায় রেহনুমা তাবাসসুম অন্তরা)

নাশতা খেতে ঢুকলাম ভিন্সি’স প্লেসে। নাশ্তার মেনু দেখে অর্ডার দিলাম ব্রেড উইথ ফ্রায়েড এগ। আমার পাশে সুমাইয়া দিলো ব্রেড উইথ অমলেট। তারপর অর্ডার আসলে আমি খেলাম সুমাইয়ারটা আর সুমাইয়া খেলো আমারটা। বড় বড় টোস্ট করা পাউরুটির সাথে সুন্দর করে ভাজা ডিম। খেতে ভালোই ছিলো। ওদিকে অন্তরার ফিশ অ্যান্ড চিপসও টেস্ট করে দেখলাম। আমরা খেতে খেতে গল্প করছিলাম। খাওয়া শেষে ৪০ রুপি বিল মিটিয়ে দিয়ে বের হয়ে গেলাম ভিন্সি’স প্লেস থেকে।

এবার আমরা হাঁটতে লাগলাম রাস্তা ধরে। একম একটা রাস্তা যে রাস্তায় আগে যাই নাই। ধীরে সুস্থে আমরা দেখতে দেখতে হাঁটতে লাগলাম। গোয়ার ঘরবাড়ি, রাস্তাঘাট, মানুষজন- সব কিছু একটু আলাদা। রাস্তা দিয়ে প্রচুর মটর সাইকেল যাচ্ছে। টুরিস্টদের জন্য ২০০-৩০০ রুপি দিয়ে সারাদিনের জন্য একটা মটর সাইকেল ভাড়া পাওয়া যায়। খ্রিস্টান সংখ্যাগরিষ্ঠ গোয়া দেখতে একেবারে সেই রকম ঠিক সিনেমাতে যেমনটা দেখা যায়!  আমাদের সামনে অনেকগুলো দোকানপাট চোখে পড়লো। নানা রকম জুয়েলারি সাজিয়ে রেখেছে দোকানে দোকানে। আমর এদিক ওদিক ঢুঁ মারতে লাগলাম। এক দোকানে ঢুকে সবাই নানা রকম জুয়েলারি পছন্দ করতে লাগলো। সবগুলো দোকানেই দাম একটু বেশি মনে হচ্ছিলো। কিন্তু সেই দোকানে আমাদের সব কিছুরই দাম কমিয়ে দিবে বললো। আমরাও উৎসাহ পেয়ে জিনিসপত্র দেখতে লাগলাম। আমরা সবাই মিলে বেশ কিছু জিনিস কিনলাম। দোকানদার আমাদের সবাইকে একটা করে ছোট আয়না উপহার দিলো। দোকান থেকে বের হতেই রুবাইদার সাথে দেখা হলো। রুবাইদা একটা তালপাতার মেক্সিকান হ্যাট কিনেছে। বিশাল মেক্সিকান হ্যাটটা দেখতে খুবই সুন্দর।

আমরা হাঁটতে হাঁটতেই ঠিক করলাম যে আমাদের কালাঙ্গুটে বিচ থেকে দূরে বাগা বিচের দিকে যাবো। তবে ঠিক বিচ ধরে নয়, রাস্তা ধরে শহর দেখতে দেখতে। বেলা গড়িয়ে দুপুর হয়ে যাচ্ছে দেখে নিশাতই অফার দিলো গতরাতের ভিক্টোরিয়াতে ঢুঁ মারার জন্য। আমরা হেঁটে হেঁটে ভিক্টোরিয়াতে ঢুকে পড়লাম। অনেক দেখেটেখে অর্ডার দিলাম প্রন নুডুলস। অনেক প্রন দেওয়া গরম গরম নুডুলস আসলো। আমরা খুব মজা করে খেলাম। ১২০ রুপি বিল দিয়ে বের হয়ে আসলাম আমরা। এরপর ডক্টর আলফন্সো রোড ধরে সোজা হাঁটতে লাগলাম আমরা। গোয়ায় ট্যাটু করানোর দোকান আছে প্রচুর। এই দোকানগুলোর বাইরে বড় বড়সব কিলবিলে ট্যাটুর ছবি। আর আছে বাদামের দোকান। শুধুই বাদাম যার বেশির ভাগই কাজু। তবে দাম বেশি। এর চেয়ে অনেক কম দামে আমি মানালি থেকে বাদাম কিনেছি। এই সব দেখতে দেখতেই একটা মোড়ে এসে অনেকগুলো বড় বড় দোকানপাট পেলাম। ব্যাঙ্ক এবং মানি এক্সচেঞ্জের দোকান দেখে নিশাত আর পৃথ্বীর ডলার ভাঙ্গানোর কথা মনে পড়লো। তাই আমরা এদিক সেদিক ঘোরাঘুরি করে সবচেয়ে ভালো ডলারের রেট আছে এমন মানি এক্সচেঞ্জ খুঁজতে লাগলাম। এরমধ্যে আমাদের সাথে দেখা হলো ফাহাদ আর তানভীরের। ওরা জুম্মার নামাজ পড়ে এসেছে। ওদের দেখে আমরা বুঝলাম আজকে শুক্রবার!

ওরাও আমাদের সাথে যোগ দিলো। সবাই মিলে একটা কাজুবাদামের দোকানে গিয়ে ডলার ভাঙ্গিয়ে নিলো। ডলার ভাঙ্গানো শেষ হলে আমরা সবাই একসাথে রওয়ানা দিলাম বাগা বিচের দিকে। ক্যাফে মোকার অনেক নাম শুনেছিলাম আমরা। একবার ভাবলাম সেখানে আগে ঘুরে আসি। একটা অটোওয়ালাকে জিজ্ঞেস করতেই ভাড়া চাইলো ৩০০ রুপি। শুনেই আমরা সেই যাত্রায় মোকা যাবার প্ল্যান বাদ দিয়ে কালাংগুটে- বাগা রোড ধরে হাঁটতে লাগলাম। বেশ কিছুদূর হাঁটার পর ফাহাদ একটা দোকান দেখিয়ে বললো গতরাতে ও এখানে গিয়েছিলো। দোকানটার নাম চকোলেট রুম। আমরাও ঢুকে পড়লাম ভিতরে। দারুন সুন্দর সুন্দর সব ডেজার্ট আইটেম সাজানো সেখানে। কোনটা ছেড়ে কোনটা অর্ডার দিবো বুঝতে পারছিলাম না। শেষে ৮০ রুপির একটা চকোলেট স্মুদি অর্ডার দিলাম। স্মুদিটা এত্ত মজা, আর বলার মত না! নিচের চকোলেটটা এতই মোটা যে খেয়েই শেষ করতে পারলাম না।

খেয়েদেয়ে আবার বের হয়ে এলাম। আবার হাঁটা শুরু করলাম। পথটা খুব ছোট নয়, তার উপর আমরা ধীরে সুস্থে গল্পগুজব করতে করতে হাঁটছিলাম। তাই সময় লাগছিলো অনেক বেশি। পথের দুপাশের দোকানগুলোর জিনিস অনেক সুন্দর। ধাতব জুয়েলারি, মুক্তার নেকলেস, পাথরেরর সেটগুলো অনেক সুন্দর সুন্দর। কিন্তু দামগুলো আকাশ্চুম্বী। আমরা খালি দেখেই যাচ্ছিলাম। কেনার উদ্দেশ্য কারও ছিলো না। এই সব দামী দামী দোকান শেষ হয়ে একসময় যখন সুভেনিয়র শপ, লিকার শপ আর নাইট ক্লাব দেখা যেতে লাগলো তখনই আমরা টের পেলাম যে বিচের কাছাকাছি চলে এসেছি। সত্যি সত্যি একটু পরই বিচ চলে আসলো। গনগনে রোদে দাঁড়িয়ে আমরা সমুদ্রের দেখা পেলাম। আমরা একটু ছায়ায় দাঁড়ালাম আর ফাহাদ আর তানভীর গেলো প্যারাসেইলিং দরদাম করতে। ওরা এসে জানালো ৮০০ রুপি লাগবে, মানুষ যত বেশিই হোক- দাম বাড়বে বা কমবে না।

এই বিচের মধ্যে দাঁড়িয়ে না থেকে আমরা ঢুকে পড়লাম একটা শ্যাকে যার নাম ‘ফ্রেশ বিচ সাইড শ্যাক’। সবাই মিলে অর্ডার দিলাম পাস্তা, রেড স্ন্যাপার ফ্রাই আর স্লাইস। অর্ডার আসতে আসতে আমি টুরিস্টদের দিকে তাকিয়ে দেখতে লাগলাম। ভারতীয় পর্যটক ছাড়াও গোয়ায় প্রচুর বিদেশি পর্যটক আসে। এদের বড় অংশ সম্ভবত রাশিয়ান কারণ অনেক দোকানের সাইনবোর্ডে রাশিয়ান ভাষায় লিখা দেখেছি। আর বেশির ভাগ পর্যটকই বয়সে তরুন। মধ্য বয়স্ক বা একটু বয়স্ক লোকের সংখ্যা কম। পরিবার নিয়ে আসা লোক মনে হলো খুবই কম। সবাই মোটামুটি বন্ধুবান্ধবের দল নিয়েই বেশি এসেছে। এসব দেখে মনে হলো গোয়া প্রধানত ‘ফুর্তি’ করার জায়গা। বিকালের তীব্র রোদে আমরা মজাদার মাছ ভাজা খেতে খেতে হাসি আড্ডায় মেতে উঠলাম। ফাহাদ একের পর এক কথাবার্তা বলে যেতেই লাগলো আর আমরা হা হা করে হাসতে লাগলাম।

সেফ
বাগা বিচের ছোটখাটো শ্যাক (কৃতজ্ঞতায় রফিকুল ইসলাম তুষার)

খাওয়া দাওয়া শেষ করে সূর্যের তেজ কমলে আমরা বের হয়ে গেলাম। সমুদ্রের পানিতে পায়ের পাতা ডুবিয়ে হাঁটতে লাগলাম। এগিয়ে যেতে লাগলাম আমাদের কালাঙ্গুটে বিচের দিকে। রাস্তাটা নেহায়েত কম নয়। তাই আমরা হাঁটতে হাঁটতেই সূর্যটার ডোবার সময় হয়ে এলো। দিনের আলোতে সব কিছু দেখে চিনতে পারি। কিন্তু অন্ধকারে আমাদের হোটেলের সামনের বিচটা কেমন করে চিনতে পারবো সেটা নিয়ে চিন্তা করে আমরা পা চালিয়ে হাঁটতে লাগলাম। কিন্তু লাভ হলো না। একটু পরেই সূর্য ডুবে গেলো। আমরা জোরে জোরে হাঁটতে লাগলাম। হাঁটতে হাঁটতে অবাক হয়ে দেখলাম সূর্য ডোবার সাথে সাথেই সবগুলো শ্যাক থেকে চেয়ার টেবিল ধরে ধরে বাইরে খোলা আকাশের নিচে নিয়ে আসা হলো। প্রত্যেকটা টেবিলে একটা করে মোমবাতি জ্বালিয়ে দেওয়া হলো। আর শ্যাকগুলোতে রংচঙ্গে বাতি জ্বলে উঠলো। দূর থেকে দেখতে ভারী সুন্দর লাগছিলো। এই দেখতে দেখতে আমরা এক সময় আমাদের হোটেলের কাছাকাছি বিচে চলে আসলাম বলে মনে হলো। সত্যি সত্যি ভালোমত খোঁজাখুঁজি করে পেয়ে গেলাম আমাদের গলিটা।

অন্ধকার হয়ে গেলেও হোটেলে ফিরে যেতে মন চাচ্ছিলো না। আমি আর সুমাইয়া একটা বিচ চেয়ারে বসে গান শুনতে লাগলাম। সুমাইয়ার মোবাইলে চলতে লাগলো, ‘মোর ভাবনারে কে হাওয়ায় মাতালো-’ । আধো অন্ধকার রাতে সমুদ্রের গর্জনের সাথে স্নিগ্ধ লোনা বাতাসে আমাদের প্রাণ জুড়িয়ে গেলো। আমরা ঠান্ডা বালিতে পা ডুবিয়ে অনেক্ষণ গল্প করলাম। সবসময় যে গল্প করলাম তা নয়, কখনো কখনো চুপ করে রইলাম দুইজনে। এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে দেখতে লাগলাম অন্ধকার সমুদ্রের বিরামহীন আছড়ে পড়া ঢেউ। আমার কখনও রাতের সমুদ্র দেখার ভাগ্য হয় নাই। এই প্রথম অন্ধকারে সমুদ্রের অন্য এক রূপ দেখতে পেলাম। এইভাবে বসে থাকতে থাকতে অনেক সময় পার হয়ে গেলো। আমাদের মোটেও উঠতে ইচ্ছা হচ্ছিলো না। কিন্তু রাত আটটা বেজে পার হয়ে গেছে। হোটেলে ফির যাওয়া প্রয়োজন। আমি আর সুমাইয়া উঠে পড়লাম। অন্ধকারে বালি পাড়িয়ে বিচ ছেড়ে ঢুকে গেলাম গলির ভেতর। হাঁটতে লাগলাম সোজা, হোটেলের উদ্দেশ্যে।

প্রথমেই হোটেলে না ঢুকে গেলাম ভিন্সি’স প্লেসে। রুবাইদাকে পেলাম সেখানে। কোনকিছু চিন্তা না করেই অর্ডার দিলাম মাশ্রুম ক্রিম পাস্তা। আবারও সেই মজাদার পাস্তা আসলো। গপাগপ খেতে লাগলাম আমি। এখানকার খাবারদাবার এত মজা যে কি আর বলবো!

খাওয়া শেষ করে সোজা হোটেলে ফিরে গেলাম। আগামীকাল প্যারাসেইলিং এর প্ল্যান করে সবাই ঘুমাতে গেলাম আমরা। আমি আবারও ফ্লোরে সটান হয়ে শুয়ে ঘুমিয়ে পড়লাম। সমুদ্রের বাতাসে আমার ঘুম ভালোই হতে লাগলো।

 

The Mighty INDIA CALLING: ইলোরার অদ্ভূত জগতে সারাদিন (পর্ব ২৭)

ঘুম থেকে উঠার আগেই টের পেলাম মজুমদার সুস্থ হয়ে উঠেছে। ওই আমাকে ঘুম থেকে ডেকে তুলতে লাগলো। মজুমদার একদম ভোরে উঠে গোসল করে ফ্রেশ হয়ে বসে আছে। আমাদেরকে সবাইকে জ্বালানোর জন্য ও বেশ লজ্জিত। আমরাও ওকে এই সুযোগে আরও জ্বালাতন করতে লাগলাম। গতকাল ওর কারণে আমরা কি কি কষ্ট করেছি সেগুলো বারবার ওকে  মনে করিয়ে দিতে লাগলাম। আমরা সময় নষ্ট না করে চটপট রেডি হয়ে গেলাম নাশতা করার জন্য। আমাদের হোটেলে কাছেই নাকি খাওয়ার জায়গা আছে বলে জাফর জানালো। জাফর সমেত আমরা চারজন বের হয়ে পড়লাম।

হোটেল থেকে নামতেই একটা ধাবার মতন টিনের চালা দেওয়া হোটেল পেলাম। নাশ্তার জন্য সবাই মিলে আমরা রুটি, ডিম ভাজা আর পরোটা অর্ডার দিলাম। আমরা আমাদের মতন বসে গল্পগুজব করতে লাগলাম। জাফরকে কোন এক জুনিয়র জানতে চাইলো ইন্ডিয়ায় ট্যুরের বিষয়ে। ওরা কয়েকজন নাকি ট্যুর দিতে চায় অল্প পরিসরে। আমরা এইসব বিষয় আশয় নিয়ে ব্যাপক আলোচনা করতে লাগলাম। এক পর্যায়ে আমাদের সব গল্পগুজব ফুরিয়ে গেলো, কিন্তু নাশতা আর আসলো না। আমরা বার বার দেখতে লাগলাম, তাগাদা দিতে লাগলাম- কিন্তু কারও কোন তাড়া আছে বলে মনে হলো না। একজন লোক আস্তে ধীরে পরোটার গোল্লা বানাতে লাগলো, সেটা সুন্দর করে বেলতেই লাগলো বেলতেই লাগলো, তারপর ধীরে সুস্থে তাওয়ায় তেল দিলো, এক সময় তেল গরম হলো, আস্তে করে তিনি পরোটাটা তাওয়ায় ছড়িয়ে দিলেন- এই পরোটা ভাজা শেষ হলে উনি আরেকটা পরোটা ঠিক একইভাবে বানানো শুরু করলেন। আমরা ধৈর্য ধরে সব দেখতে লাগলাম। পাঁচটা পরোটা একই নিয়মে বানানোর পর উনি আস্তে ধীরে দুইটা ডিম ভেঙ্গে, পিয়াজ মরিচ দিয়ে ফিটে ধীরে সুস্থে একটা ডিম ভাজলেন। সব মিলিয়ে প্রায় ৪৫ মিনিট পর উনি ৫টা পরোটা আর ৫টা ডিম ভাজা নিয়ে আমাদের টেবিলের সামনে দিয়ে গেলেন। কিন্তু আমাদের অর্ডার পাঁচটা পরোটা ছিলো না। অনেকে রুটি চেয়েছিলো, তাই উনি পরোটা ফেরত দেওয়ার সময় বলে গেলেন এখনই রুটি বানানো শুরু করবেন। এই কথা শুনে ভয় পেয়ে রুটির অর্ডার ক্যান্সেল করে সবাই পরোটা নিয়ে নিলো। এখন রুটি বানানো শুরু করলে নিশ্চয়ই পাক্কা আরও এক ঘন্টার ধাক্কা!

কোনমতে খেয়ে দেয়েই আমরা দৌড় দিলাম। রুমে গিয়ে আগের দিন রাতে গুছিয়ে রাখা ব্যাকপ্যাকটা নিয়ে নেমে পড়লাম সবাই। কিছুক্ষণের মধ্যেই আমাদের গোয়েল ছেড়ে দিলো। আমরা চলতে লাগলাম ইলোরার উদ্দেশ্যে। গোয়েল চলতেই লাগলো দুপাশের বন জঙ্গল পার বয়ে। এর মধ্যে চিং আর উর্মির বেশ জ্বর ছিলো। উর্মি বেচারির মুখ জ্বরের চোটে লাল হয়ে রইলো। মোটমাট আমাদের চার ঘন্টা লাগলো ইলোরায় পৌঁছাতে। বাস আমাদের যেখানে নামিয়ে দিলো সেখান থেকে ইলোরার গেট কিছুটা দূর। বাস থেকে নেমেই আমরা টসটসে আঙ্গুর কিনে নিলাম ১০ রুপি দিয়ে। আমাদের দেশে ১০ টাকার আঙ্গুরের কথা ভাবাই যায় না। সবাই অতি উৎসাহে টপাটপ আঙ্গুর খাওয়া শুরু করলো। আমি খুঁজে খুঁজে একটা রেস্টুরেন্টের ওয়াশ রুম বের করলাম। সেখানে বেসিনে সুন্দর করে ধুয়ে নিলাম আঙ্গুরগুলো। তারপর খাওয়া শুরু করলাম।

আঙ্গুর খাওয়া শেষ হতেই ঝটপট অটো ভাড়া করে আমরা রওয়ানা হলাম ইলোরার দিকে। ঠিক হলো অটো আমাদের পুরো ইলোরা ঘুরে দেখাবে। প্রথমেই আমাদের নামিয়ে দিলো ২৯ নম্বর গুহায়। সেই আগের মত পাথর কেটে বানানো গুহা তবে এইখানে আছে বিশাল বিশাল সব পাথুরে মূর্তি। একেকটা ১৫-২০ ফিটের সমান। এই গুহা গুলো অজন্তার তুলনায় বেশ খোলামেলা, আর আলো বাতাস পূর্ণ। একটা করে গুহা দেখা শেষ হয় আর আমরা ছুটে গিয়ে অটোতে উঠি। অটো আমাদের নিয়ে রওয়ানা হয় পরের গুহার দিকে। অজন্তার গুহা গুলা যেমন খুব কাছাকাছি ছিলো, ইলোরারটা মোটেও সেরকম নয়। বরঞ্চ অনেক দূরে দূরে। এভাবে ঘুরতে ঘুরতে ৩২ নম্বর গুহায় গিয়ে হাজির হলাম। সেটা ছিলো দোতলা গুহা। ভিতরে সিড়ি আছে উপরের তলায় যাওয়ার জন্য। সিড়ি গুলো খুবই অদ্ভূত। অনেক খাড়া আর অনেক সরু। একেকটা রাইজার প্রায় এক ফিট উঁচু হবে আর ট্রেড অনেক সরু যাতে কোনমতে পায়ের পাতার অর্ধেকটা আঁটে। টুরিস্টদের পদচারনার চোটে খসখসে পাথুরে সিড়ি মসৃন হয়ে গেছে যেটা দেখে আমি সবচেয়ে বেশি ভয় পেলাম। যাই হোক আল্লাহ নাম নিয়ে উঠে পড়লাম সিড়ি বেয়ে। তবে নামার সময় ভয়টা হলো আরও। জেরিনকে বলতে শুনলাম, ‘সিড়িগুলা কি জায়ান্টদের জন্য বানানো?’

ওফ
দূরে থেকে ইলোরার গুহা (কৃতজ্ঞতায় রফিকুল ইসলাম তুষার)

কোন কোন গুহা খোলা পাহাড়ের উপরে, কোনটার সিলিঙে বিশাল পদ্ম ফুল খোদাই করে বানানো, কোনটায় যেতে হয় অনেক চড়াই উতরাই পার হয়ে, কোন গুহা দেখতে আবার একদম ঘরবাড়ির মত- দরজা, জানালা, রুম গুলা ভাগ করা, কোনটার সামনে বিশাল এক গরুর মূর্তি যাকে বলা হয় নান্দী বুল- এই রকম নানা বৈশিষ্ট্যের গুহা আমরা ঘুরে ঘুরে দেখলাম। দেখতে দেখতে আমাদের প্রায় সব এনার্জি বের হয়ে গেলো। শেষমেশ অটো আমাদের ১৬ নম্বর গুহার সামনে নামিয়ে দিয়ে গেলো। আমরা অটো ভাড়া ১৬০ রুপি দিয়ে অটো ছেড়ে দিলাম। এসে দাঁড়ালাম একটা পাথুরে পাহাড় কেটে বানানো অর্থাৎ ‘মনোলিথিক রক কাট’ বিশাল এক মন্দিরের সামনে যার নাম ‘কৈলাস টেম্পল’। এই মন্দির পাহাড়ের উপর থেকে পাথর কেটে কেটে ভিতরে গর্ত করে বানানো হয়েছে। আমরা যেখানে দাঁড়িয়ে ছিলাম সেটা বলতে গেলে পাহাড়ের পেটের মধ্যে গর্ত করে বানানো সমতল জায়গাটা। সমতল জায়গাটার মাঝখানে উঁচু একটা মন্দির আর তার চারপাশে উঁচু হয়ে আছে পাহাড়। আমি পুরা থ হয়ে গেলাম। কি আশ্চর্য, হাজার বছর ধরেও এই রকম একটা জায়গায় মন্দিরটা টিকে আছে!

শ খানেক হাতির উপর কৈলাশ মন্দির
শ খানেক হাতির উপর কৈলাশ মন্দির

আমরা ঘুরে ঘুরে দেখতে লাগলাম। মন্দিরের চারপাশে খোলা জায়গা ছাড়াও পাথুরে পাহাড়ের দেওয়ালে গর্ত করে মোটা মোটা পাথুরে কলাম দিয়ে সাপোর্ট করা প্রদক্ষিণ পথ ছিলো। আমরা সেখান দিয়ে ঘুরে বেড়াতে লাগলাম। এই পুরো পাহাড়টা কেন যে ধসে পড়ে যাচ্ছে না সেইটা ভাবতে ভাবতেই আমি ঘুরতে লাগলাম। শতকোটি মূর্তি বিশিষ্ট মন্দিরটা চক্কর দিয়ে ফেলে আমরা ভিতরে ঢুকে পড়লাম। বাইরে পাথর কেটে নকশা করা ছাড়াও সারা মন্দিরটা ছিল হাল্কা কমলা রঙয়ের, এর মধ্যে লাল, সবুজ আর হলুদ রঙ দিয়ে অত্যন্ত সূক্ষ্ম কারুকাজ করা। অনেক জায়গার রঙই নষ্ট হয়ে গেছে। হাজার বছরের পুরানো রঙ- কম কথা নয় তো! ভিতরের অবস্থা তো আরও জটিল, সেখানে সত্যি সত্যি পুজা অর্চনা হচ্ছে। আমি খানিক্ষণ নিশ্বাশ বন্ধ করে দেওয়ালের কারুকাজগুলার উপর হাত বুলালাম। আবছা আলোতে দেখলাম রঙ্গিন সিলিং। সব দেখে টেখে আমরা খোলা বারান্দার মত জায়গায় বের হয়ে আসলাম। আমি মিমের সাথে গল্প করতে করতে হাঁটতে লাগলাম। একটা ‘নান্দী বুল’ পার হয়ে আমরা বসে অনেক্ষণ গল্প করলাম। এই আশ্চর্য রহস্যময় জায়গাটা থেকে চোখ সরাতে পারছিলাম না। মনের ভিতর ভাবনা চলতেই লাগলো হাজার বছর আগে কেমন করে সম্ভব হয়েছিলো এই রকম পাথুরে পাহাড়ে এই রকম স্থাপনার? কেমন করে?

পাহাড়ের তলায় প্রদক্ষিণ পথ
পাহাড়ের তলায় প্রদক্ষিণ পথ

ফোন আসতে লাগলো, সবাই নাকি খেতে বসে গিয়েছে। আমি আর মিমও ছুটলাম ক্যান্টিনের দিকে। আমি আর রুবাইদা মিলে অর্ডার দিলাম ৮০ রুপির ভেজ ফ্রায়েড রাইস। একটু শক্ত চালের হলেও খেতে ভালোই ছিলো। খেয়ে দেয়ে আমরা ধীরে সুস্থে গোয়েলে ফেরত গেলাম। সেখানে অনেক ফেরিওয়ালা নানা রকম মালা নিয়ে ঘোরাঘুরি করছিলো। ছোট ছোট পুতির একটা ভারি প্যাঁচানো মালা ৫০ রুপি দিয়ে সবাই কিনতে লাগলো গণ হারে। এক পর্যায়ে সারা তল্লাটের সকল ফেরি ওয়ালা দৌড়ে আসলো মালা সমেত। একজন লোক আবার ছোট্ট চালের দানার উপর নাম লিখে চিকন এক শিশি তেলের ভিতর ভরে চাবির রিং বানিয়ে দিচ্ছিলো। আমি একটা চাবির রিং বানিয়ে নিলাম আমার কামলা পিউয়ের জন্য। তারপর দেখলাম এই যাত্রাই আমাদের গোয়েলের সাথে শেষ যাত্রা বলে সবাই একটু ছবিটবি তুলতে আগ্রহী হয়ে উঠলো। আমরা গোয়েলের সাথে অনেক ছবি তুললাম, ভিডিও ও করলাম। সবশেষে বিকাল ৬টার দিকে রওয়ানা হলাম গোয়ার উদ্দেশ্যে। গোয়েল যাত্রা শুরু করতেই আমরা একটা আনন্দধ্বণির চিৎকার করে উঠলাম।

গোয়েল চলতেই শুরু করলো। সন্ধ্যা ঘনিয়ে রাত হলো। ওদিকে বাসের শেষে বসে রিন্তু নানা রকম কর্মকান্ড করে আমাদের হাসাতে লাগলো। রিন্তু একসময় বিটিভির ধারাভাষ্য দিতে শুরু করলো। অবনী শুরু করে দিলো রাত দশটার ইংরেজি সংবাদ পড়া। আমরা হাসতে হাসতে গড়িয়ে পড়লাম। একে একে রিন্তু একচেটিয়া বিভিন্ন সুর নকল করে প্যারোডি করতে লাগলো ইত্যাদি, ছায়াছন্দ আর সিসিমপুরের। সারা বাস জুড়ে হাসির রোল উঠলো। হাসতে হাসতে আমাদের পেট ব্যাথা হতে লাগলো।

প্রায় গভীর রাতে আমাদের বাস এসে থামলো অর্পিতা ধাবা নামের এক ধাবায়। এটা বাঙালি ধাবা। ভিতরের লোকজন সব বাংলায় কথা বার্তা বলছে শুনে আমার খুব ভালো লাগলো। বাস থেকে নেমেই আমরা বাথরুমের সন্ধানে গেলাম। এখানকার মেয়েদের বাথরুমে কোন লাইট নাই। কি আর করা মোবাইলের ফ্ল্যাশ লাইট জ্বেলে সেই সমস্যার সমাধান করা হলো। আমরা ৪৬ জন মানুষ গাদা খানেক জিনিস অর্ডার দিয়ে বসে রইলাম। অর্ডার আর আসে না। প্রথমে আমরা আলু মাসালা আর নান অর্ডার দিয়েছিলাম। এটা দিতে দেরি হবে দেখে আমি আর রুবাইদা চট করে অর্ডার চেঞ্জ করে পাও ভাজি অর্ডার দিয়ে দিলাম। আমাদের অর্ডার চলে এলো সাথে সাথেই। অন্যরা আমাদের দিকে হিংসাপূর্ণ দৃষ্টি দিতে লাগলো। আমি আর রুবাইদা মজা করে পাওভাজি খেলাম। আমাদের খাওয়া শেষ হয়ে যাওয়ার পরও অনেকের অর্ডার তখনও আসে নাই। শুভ তো রেগেমেগে না খেয়েই বের হয়ে আসলো ওখান থেকে। আমি পানি আর বিস্কুট কিনে নিলাম। তারপর আবার চড়ে বসলাম গোয়েলে।

গভীর রাতে আমাদের নিয়ে গোয়েল চলতে শুরু করলো। সারা বাস ঘুমিয়ে পড়লো, আমি আর রুবাইদা অনেক রাত পর্যন্ত গল্প করলাম। ঘুমন্ত বাসে শুধু আমাদের দুইজনের গলাই শোনা গেলো।

The Mighty INDIA CALLING: গান্ধী মেমোরিয়াল, ল’ গার্ডেন, মুভি দেখা এবং কমিটির গ্র্যান্ড ডিনার (পর্ব ২৪)

বেসমেন্টে রুমে থাকার একটা সমস্যা হলো দিন রাতের পার্থক্য বুঝতে না পারা। কি সকাল, কি দিন, কি রাত- সবসময় একই রকম অন্ধকার থাকে রুমটা। অন্ধকার রুমে যখন ঘুম ভাংলো তখন দেখলাম সাড়ে নয়টা বাজে। তাড়াহুড়া করে উঠে আমরা ফ্রেশ হয়েই রুম থেকে বের হয়ে গেলাম। তারপর টের পেলাম শুধু আমরা না, কেউই এখনো পর্যন্ত রেডি হয় নাই। তারমানে সবারই রওয়ানা দিতে বেশ দেরি হবে। এই হোটেলে না খেয়ে ভাবলাম আসেপাশে ঘোরাঘুরি করে খাওয়াদাওয়া করি।

আমি আর রুবাইদা বের হয়ে ডান দিকে হাঁটতে লাগলাম। হোটেলের একটু পাশেই একটা মুসলমান হোটেল পেলাম যেখানে হালাল মাংস পাওয়া যাচ্ছিলো। আমরা সেখানে বসে পড়লাম। আমি অর্ডার দিলাম ৩ রুপি করে দুইটা নান রুটি আর ৩০ রুপির খাসির কোরমা। কোরমা বললেই আমাদের চোখে যেমন সাদা রঙের ঘন দুধের ঝোলের তরকারি ভেসে ওঠে, এই কোরমা সেই রকম নয়। এটা তেল দেওয়া লাল টকটকে রঙের মসলাদার ঝোলওয়ালা খাসির মাংসের তরকারি। আমি ভ্রূ কুঁচকে তাকাতেই রুবাইদা বললো নতুন ধরনের এই ‘কোরমা’টা উচ্চবাচ্য না করে খেয়ে ফেলতে। আমি খেয়ে দেখলাম খেতে বেশ মজা তবে একটু ঝাল। আমরা তৃপ্তি করে খেলাম। আহমেদাবাদে খাওয়া খরচ আসলেই কম। খাওয়া দাওয়া করতে করতেই আমরা আলোচনা করছিলাম কেমন করে কোথায় যাব। খাওয়া দাওয়া শেষ করে হাঁটতে লাগলাম আমাদের হোটেলের দিকে। আমার বেশ ঝাল লাগছিলো আর পানি খাওয়া হয় নাই বলে একটা স্লাইস কিনে খেলাম আমি। এর মধ্যে মিম আর অন্তরা এসে পড়লো। আমরা চারজনে ঠিক করলাম যাবো ‘গান্ধীর সবরমোতি আশ্রম’। আগের দিনের অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নিয়ে ভাবলাম অনেক তো অটো হলো- এইবার বাসে করে যাই।

আহমেদাবাদে আসার পর থেকেই দেখতে পাচ্ছিলাম এখানকার রাস্তাগুলো একটু অদ্ভূত। রাস্তাগুলো ডিভাইডার দিয়ে চারভাগে বিভক্ত। খালি দুইপাশের লেন দুইটা দিয়ে গাড়ি ঘোড়া চলে। মাঝের লেন দুইটা দিয়ে কি হয় খেয়াল করি নাই। বাসের টিকেট কাটতে গিয়ে টের পেলাম মাঝের দুইটা লেন শুধুই বাসের জন্য। আর এই বাসের নামই ‘বি আর টি এস’। আমরা টিকেট কাউন্টারে গিয়ে বললাম গান্ধীর সবরমোতি আশ্রম যেতে চাই। ওরা আমাদের ২৮ টাকা করে ‘আর টি ও রোড’ এর টিকেট কেটে দিলো। আমরা টিকেট নিয়ে ওয়েটিং এ বসে রইলাম। বেশ দৃষ্টি নন্দন ছিলো যাত্রী ছাউনিটা। আমরা বসে বসে দেখতে লাগলাম হুউউশ করে একেকটা বাস এসে থামছে, কয়েক সেকেন্ড পরই আবার হুউউশ করে বের হয়ে যাচ্ছে। আমরা তক্কে তক্কে থাকলাম আমাদের নির্দিষ্ট নম্বরের বাসের জন্য। এক সময় আমাদের কাংখিত বাস আসলো। কয়েক সেকেন্ডের জন্য দরজাটা খুললো, আর অন্য অনেক মানুষের সাথে আমরা চার জন হুড়মুড় করে উঠে পড়লাম। ওঠার প্রায় সাথে সাথেই ঠাস ঠাস করে দরজাটা অটোমেটিক বন্ধ হয়ে গেলো। আর প্রচন্ড বেগে আমাদের বাস চলতে শুরু করলো। ভীড়ের জন্য আমরা বসার কোন জায়গাই দেখতে পাচ্ছিলাম না। কোন কিছু হাত দিয়ে ধরার আগেই বাস ছেড়ে দেওয়ায় আমরা তাল সামলাতে না পেরে একজন অন্যজনের উপর হেলে পড়লাম। এর মধ্যে মিম উপরে ঝুলতে থাকা একটা খালি হাতল কোনমতে ধরে ফেললো। আমি কোন কিছু ধরতে না পেরে শেষমেষ মিমকেই দুই হাতে শক্ত করে জড়িয়ে ধরে রাখলাম। এই ভীড়ের মধ্যেই মিমের হাতে চপচপে তেল দেওয়া এক লোকের চুল ঘষা খাচ্ছিলো। মিম বেশ বিরক্ত হলো কিন্তু কিছু বলার উপায় নাই।

আলোর গতিতে আমাদের বাস চলতে লাগলো। যেহেতু এটা শুধু বাসেরই লেন তাই সামনে অন্য কোন গাড়ি বা ওভারটেকিং এইসব ব্যাপার নাই। প্রচন্ড গতিতে চলতে থাকা বাসটা কেবল স্টপেজ আর মোড় আসলেই হার্ড ব্রেক কষে, আর সারা বাসে শুধু আমরা চার জনই তাল সামলাতে না পেরে ঢলে কাত হয়ে যাই। বাস একেক স্টপেজে থামে আর অল্প কিছু মানুষ নামে, বেশিরভাগই ওঠে। এমনিতেই ভেতরে কোন জায়গা নাই, কিন্তু এটা নিয়ে কারও কোন চিন্তা আছে বলে মনে হলো না। হেল্পার ছাড়াই বাসে দিব্যি লোকজন ঠেলাঠেলি করে ঊঠতে লাগলো। ভীড়ের মধ্যে অন্তরাকে দেখতে পাচ্ছিলাম না। রুবাইদাকে দেখতে পেলাম সবচেয়ে অসুবিধায় আছে। কোন খালি জায়গা না পেয়ে ও বাসের দরজার সামনের খালি জায়গাটুকুতে দাঁড়িয়েছে। প্রতিবার বাস স্টপেজে থামে আর অটোমেটিক ফোল্ডিং দরজাটা খোলার সময় প্রথমেই রুবাইদা ঠাস ঠাস করে বাড়ি খায়। তারপর দলে দলে মানুষজন ওকে ধাক্কা মেরে বাসের ভিতরে ঢুকে। তারপর আবার দরজা বন্ধ হলে ও সামনের সেই ফাঁকা জায়গাটাতে দাঁড়ায়। ওর অবস্থা দেখে মায়াই লাগলো।

ইন্ডিয়ার একেক রাজ্য একেক উপায়ে তাদের পাবলিক ট্রান্সপোর্টেশোন সমস্যা সমাধান করে রেখেছে। এর মধ্যে আহমেদাবাদের বি আর টি এস বাস সার্ভিসটা খুবই ইউনিক মনে হলো। বাসের ভেতরের দৃশ্য দেখলে যে কারও এটাকে মেট্রো মনে করে ভুল হতে পারে। মেট্রোর মতনই বসার সিট খুবই কম। দাঁড়ানোর জায়গাই বেশি। আর একটু পর পর যান্ত্রিক কন্ঠে অ্যানাউন্সমেন্ট বাজছে ‘ ধেয়ান দিজিয়ে, আগলা স্টেশন অমুক অমুক-’ ঠিক যেন মেট্রোর মত। ভিড়ের মধ্যে চিড়ে চ্যাপ্টা হয়ে থাকতে থাকতেই হঠাৎ একটা স্টপেজ আসলো আর বাসের অর্ধেক লোক নেমে গেলো। আমরা একটু হাঁফ ছেড়ে বাঁচলাম। বাস এতই ফাঁকা হয়ে গেলো যে আমরা বসার সিটও পেয়ে গেলাম! অবশ্য বেশিক্ষণ বসতে না বসতেই আমাদের স্টপেজ আর টি ও রোড চলে আসলো। আমরা তাড়াতাড়ি করে নেমে পড়লাম। আমাদের নামিয়ে দিয়েই বাস হুউউশ করে চলে গেলো।

গুগল ম্যাপে দেখলাম যেখানে দাঁড়িয়ে আছি সেখান থেকে আশ্রমটা খুব দূরে নয়, হেঁটেই যাওয়া যায়। কিন্তু এই বাস জার্নি শেষে কারও গায়ে আর কোন শক্তি নেই। তাই আমরা ২০ রুপি দিয়ে একটা অটো ভাড়া করলাম আশ্রম পর্যন্ত যাওয়ার জন্য। অটো আমাদের আশ্রমের গেটেই নামিয়ে দিলো। আমরা গেট দিয়ে ভিতরে ঢুকলাম। খুব সুন্দর শান্তি শান্তি পরিবেশ। চার পাশে সবুজ গাছপালা, ঝলমলে রোদ আর হাজারো পাখির কিচিরমিচির। ঢুকতেই সবার মন ভালো হয়ে গেলো।

প্রথমে গেলাম গান্ধী স্মারক সংগ্রহালয়ে। এটা একটা ছবির মিউজিয়াম। মহাত্মা গান্ধীর পুরো জীবন ও আদর্শ ধারাবাহিকভাবে সাদাকালো ছবির মাধ্যমে উঠে এসেছে। চার্লস কোরেয়ার ডিজাইন করা ইট আর কনক্রিটের তৈরি এই মিউজয়ামের প্রদর্শনীর কিছু অংশ সেমি আউটডোর অর্থাৎ খোলা বারান্দার মত জায়গা, কিছু অংশ ইন্ডোর অর্থাৎ রুমের ভেতর। আমরা ঘুরে ঘুরে দেখতে লাগলাম সব কিছু। মাঝে মাঝে দেখা হতে থাকে সীমান্ত, ইশতিয়াক, হিমি, নিশাত, তমা রিন্তু, সুহাইলা, নিলয়দের সাথে। পুরো প্রদর্শনী ঘোরা শেষে আমরা ঢুকি সুভেনিয়র এবং বুক শপে। সেখানে অনেকেই অনেক কিছু কিনলো। বাচ্চাদের জন্য গান্ধীর কমিক্স থেকে শুরু করে গবেষণা পত্র পর্যন্ত সব কিছুই পাওয়া যাচ্ছিলো। সুন্দর সুন্দর কলম, চাবির রিং, পেন ড্রাইভ, পোস্ট কার্ড, ঘড়ি অনেক কিছুই ছিলো। আমি ৫০ রুপি দিয়ে বাংলায় অনুদিত গান্ধীর আত্মজীবনী কিনলাম। সব শেষে মিউজয়াম থেকে বের হয়ে গেলাম।

দচ
‘My Life Is My Message’ – M.K Gandhi (কৃতজ্ঞতায় নিশাত তাসনিম দিশা)

এরপর গেলাম গান্ধীর বাড়ি দেখতে। সবরমোতি নদীর পাশে খুব সাধারন একটা কুটির। আমরা স্যান্ডেল খুলে ভিতরে ঢুকলাম। এত শান্তি লুকিয়ে আছে এই ছোট্ট কুটিরে বাইরে থেকে দেখে বুঝতে পারি নাই। প্রত্যেকটা জানালার সবুজ প্রাকৃতিক ক্যানভাস আর প্রাণ জুড়ানো মিষ্টি বাতাস মনের মাঝে ধীরতা, স্থিরতা আর প্রশান্তির উদ্রেক করে। দেখলাম গান্ধীর চরকা, অতি সাধারণ বসার আসন, গান্ধীর ব্যবহার্য সাধারণ জিনিসপত্র, ঘুমানোর জন্য সুতায় বোনা খাটিয়া। এক ঘর থেকে বারান্দা দিয়ে আরেক ঘরে যেতে লাগলাম আমরা। কি সাধারণ এই ঘর গুলোতে অসাধারণ সব মানুষজন এসেছিলেন…….. কতই না সামান্য সাধারণ ছিলো তাদের জীবন……………. অথচ কতই না বড় মাপের হৃদয় ছিলো তাদের………। আমরা এখান থেকে বের হয়ে খানিক্ষন বসলাম সবরমোতী নদীর তীরে। প্রচন্ড কড়া রোদে অবশ্য আমরা বেশিক্ষণ ওখানে দাঁড়াতে পারলাম না। অল্প কিছুক্ষনের জন্যই দেখলাম টলটলে পানির সবরমোতি নদীকে। আমাদের বুড়িগঙ্গার মত এই নদীর দুই পারেও শহর। কিন্তু তারপরও কত সুন্দর অবস্থা এই নদীটার! আর আমাদের বুড়িগঙ্গা- থাক সে কথা আর নাই বা বলি।

আমরা দর্শনার্থীদের জন্য তৈরি বাথরুমে গেলাম। এখানকার বাথরুমটাও ভারি সুন্দর। অনেক চওড়া, প্রশস্থ আর আলোবাতাস পূর্ণ। আমরা খুব খুশি মনে হাতমুখ ধুয়ে নিলাম। একবার নয়- বেশ কয়েকবার! ফুরফুরে মনে এখান থেকে বের হয়ে আসলাম আমরা। এরপর অটো ঠিক করলাম আমরা- যাবো ‘ল গার্ডেন’।

অটোওয়ালা আমাদের নামিয়ে দিলো শহরের মধ্যে এক জায়গায়। সামনে হাত তুলে দেখিয়ে দিলো ‘ল গার্ডেন’। ল গার্ডেন একটা ছোট্ট পার্ক। এর বাইরের ফুটপাথের দুইপাশ জুড়ে সারি সারি দোকানপাট। আমরা ঠিক করলাম আগে খেয়ে নেই, তারপর ঘোরাঘুরি করা হবে। রুবাইদা গেলো স্ট্রিট ফুডের দিকে আর মিম ও অন্তরার সাথে আমিও ঢুকলাম ডমিনাস পিৎজাতে। কিন্তু ভেজ পিৎজা শেয়ার করার পার্টনার নাই বলে আমি বের হয়ে আসলাম ওখান থেকে। বের হয়ে রুবাইদাকে খুঁজতে লাগলাম। দেখি ও কাগজের বাটিতে করে মিহিদানা বা বুন্দিয়ার মত কি এক অদ্ভূত জিনিস খাচ্ছে। আমি জিজ্ঞেস করতেই ও বললো, এই জিনিসের নাম ওকে খিচুড়ি বলেছে। কিন্তু এটা হচ্ছে মশলা দিয়ে রান্না করা সাগুদানা। জিনিসটা খেতে মোটেও ভালো না। রুবাইদাকে দেখলাম বিরস বদনে ‘খিচুড়ি’ চিবিয়ে যাচ্ছে। রুবাইদার খাওয়া শেষে আমরা দুইজনে হেঁটে হেঁটে যেতে লাগলাম সেই ফুটপাথের দোকানপাটগুলোর দিকে।

সারি সারি দোকানপাট। সেগুলোতে ভর্তি গুজরাটি কাজ করা জামা কাপড়, জুয়েলারি, জয়পুরি স্যান্ডেল, ওয়ান পিস- এইসব জিনিস। গুজরাটি লেহেঙ্গা চোলিগুলোতে বড় বড় কাঁচের টুকরা বসানো, অনেক রঙের কাপড় জোড়া দিয়ে বানানো- চোখ ধাঁধাঁনো ঝকমকে। আমার চোখে কল্পনায় জয়পুরকে আমি এরকমই ভেবেছিলাম। এই রকম দেখলাম এসে গুজরাটে। আমরা এ মাথা থেকে ও মাথা হাঁটতে লাগলাম। আমার দুপুরে কিছু খাওয়া হয় নাই। একেবারে ল গার্ডেনের শেষে রাস্তার উল্টা পাশে একটা বড় শপিং মলের নিচে অনেকগুলো ফাস্টফুডের দোকান দেখে আমি থেমে গেলাম। সবগুলো দোকান দেখে শেষ পর্যন্ত একটা দোকানে ঢুকে ৬০ রুপি দিয়ে ভেজ বার্গার ফ্রেঞ্চ ফ্রাই আর কোক খেয়ে নিলাম। খেয়েদেয়ে আমরা আবার হাঁটতে লাগলাম। আশেপাশে অসংখ্য দোকান কিন্তু সব দোকানেই প্রায় একই জিনিস। আমরা এই গলি ছাড়িয়ে অন্য গলিতে ঢুকে পড়লাম। কিছুদূর হেঁটেই সন্ধান পেলাম ‘তক্ষশীলা’র। ‘তক্ষশীলা’ একটা চমৎকার বইয়ের দোকান। ভেতরে ঢুকেই আমাদের মন ভালো হলে গেলো। দারুন সুন্দর সুন্দর বই। ঝকঝকে সব বইয়ের মধ্যে এনিড ব্লাইটনের অনেক অনেক বই, ন্যন্সি ড্রিউয়ের ফুল কালেকশন আর হ্যাঁ- যেটার কথা কোনদিনই ভুলবো না সেটা হচ্ছে তিন বাক্স টিনটিনের অরিজিনাল ফুল সেট যার দাম ৮০০০ রুপি। নীল বাক্স থেকে একটা টিনটিন বের করে হাতে নিয়ে একবার দীর্ঘশ্বাস ফেললাম। পৃষ্ঠাগুলো হাত দিয়ে ছুঁয়ে দেখলাম- পুরা মাখনের মত, ঝকঝকে ছবিগুলা আমাকে তীব্রভাবে আকর্ষণ করতে লাগলো- কিন্তু কিছুই করার নাই! সবগুলা টিনটিন সেই বাচ্চাকাল থেকেই আমার বাসায় আছে, এই সেট কেনার কোন অর্থই হয় না। কিন্তু তারপরও আমার মন আঁকুপাকু করতে লাগলো। শেষমেশ সবার তাড়া খেয়ে আমি বইগুলো ছেড়ে উঠে আসলাম। আমাদের মধ্যে কেবল অন্তরাই ওর ভাইয়ের জন্য ‘টিন ডিটেক্টিভস’ এর মোটা মোটা কমিক্স কিনলো।

আমরা বের হয়েই একে ওকে ফোন দিতে লাগলাম। কারণ আমাদের মুভি দেখার জায়গা এখনও ঠিক হয় নাই। কোন এক ড্রাইভ ইন সিনেমাতে যাওয়ার কথা ছিলো কিন্তু সেটা ফাইনাল না। পরে আমরা ফোন দিয়ে জানলাম আমাদের যেতে হবে আমরা যেখান থেকে এসেছি সেখানে- আশ্রম রোডের শিব সিনেমা হলে। আমরা তক্ষশীলার সামনে থেকে ২০ রুপি দিয়ে অটো ঠিক করলাম। সেই অটো করে আমরা পৌঁছে গেলাম আমাদের সিনেমা হলের সামনে। ঠিক উল্টা পাশে আরেকটা সিনেমা হল থাকায় একটু কনফিউশন হচ্ছিলো যে কোনটা আমাদের সিনেমা হল, তারপর গিয়ে ঠিকঠাকটাতে গিয়ে হাজির হলাম। সিনেমা শুরু হতেও অনেক্ষন বাকি। আমরা লবিতে দাঁড়িয়ে কয়েকটা সেলফি তুললাম। এর মধ্যেই দেখলাম মাইশা দুই হাত ভরে শপিং করেছে ‘ক্রস ওয়ার্ড’ থেকে। সবই স্টেশনারি। আমরা বেশ উত্তেজিত হয়ে দেখতে লাগলাম ওর জিনিসপাতি। এরই মধ্যে শোর সময় হয়ে গেলে আমরা ঢুকে পড়লাম। সিট বেশ আরামদায়ক আমাদের স্টার সিনেপ্লেক্সের মত। প্রথমে শামিতাভ, তারপর রয়ের ট্রেইলার চললো। তারপর শুরু হলো ‘বেবি’। নাম শুনে ভেবেছিলাম লেইম মুভি হবে বোধহয়। কিন্তু আমার আশংকা ভুল হলো। দারুণ থ্রিলার একটা মুভি- খুবই সুন্দর।

dc
সিনেমা হলে ঢুকার আগে লাউঞ্জে কতিপয় দ্বিমিকবাসী (কৃতজ্ঞতায় মোজাম্মেল হক জাফর)

মুভি শেষ হতে হতেই কমিটি আমাদের তাড়া দিতে লাগলো। ডিনারের জন্য বুকিং দেওয়া যেই জায়গা, সেখান থেকে ফোন আসছে। দশটার মধ্যে নাকি তাদের অর্ডার নেওয়া বন্ধ হয়ে যায়। আমরা সবাই ছুটতে লাগলাম। সারি সারি অটোরিক্সায় টপাটপ উঠে পড়তে লাগলাম আমরা। সবার গন্তব্য প্যারামাউন্ট হোটেল- তিন দরওয়াজা। প্যারামাউন্ট হোটেলে পৌঁছে ৫০ রুপি ভাড়া দিয়ে নেমে পড়লাম। তাড়াহুড়া করে ভিতরে ঢুকে দেখি কোথাও কোন বসার জায়গা নেই, সব কানায় কানায় পূর্ণ। আমরা এদিক ওদিক দৌড়াদৌড়ি করতে লাগলাম, কিন্তু লাভের লাভ কিছুই হলো না। তবে ওরা আশ্বাস দিলো যে কিছুক্ষনের মধ্যেই কয়েকটা টেবিল খালি হয়ে যাবে। সত্যি টেবিল খালি হওয়ার সাথে সাথে আমি, রুবাইদা, অন্তরা, মিম, সারা আর সুহাইলা একসাথে বসে পড়লাম। বাকিরাও ফাঁক ফোকর পেয়ে বসে যেতে লাগলো। আমাদের টেবিলে আমরা মিলেমিশে অর্ডার দিলাম- তিনটা প্রন পোলাও, ভেজ আমেরিকান চপ্সুয়ে, মাসালা চিকেন আর সাথে পেপসি। মুসল্মান হোটেল তাই চিকেন অর্ডার দিতে কোনই বাধা রইলো না। আমরা মজা করে খেলাম। রুবাইদা পেপসি অর্ডার দিতে চায় নাই, আমরা এক প্রকার জোর করে ওর পেপসিটা খেয়ে ফেললাম। হাহা হিহি গল্পগুজবের সাথে আমাদের খাওয়া দাওয়া চলতে লাগলো। এক সময় পুরো রেস্টুরেন্ট খালি হয়ে গেলো। শুধু রইলাম আমরা। তবুও যেন আমাদের গল্প শেষ হয় না।

কমিটি সবার বিল দিয়ে দিলো। আমরা যখন ভরপেট খেয়ে ওখান থেকে বের হয়ে আসি তখন বাজে রাত সাড়ে এগারটা। তিন দরওয়াজা পার হয়ে আমরা একটার পর একটা অটো নিতে থাকি। লাইন ধরে সব অটো চলতে থাকে ‘ত্রুপ্তি হোটেল’ এর উদ্দেশ্যে। আর আমরা অটোতে গাদাগাদি করে বসে খোশ গল্প করতে থাকি। হোটেলে পৌঁছানোর পর আমরা শুনি গোয়েল থেকে আমাদের লাগেজ নামানো হবে। সবাই হোটেলের সামনে ভীড় করে দাঁড়াই। এক সময় গোয়েল আসে, আমরা আমাদের লাগেজ টেনে টেনে রুমে নিতে থাকি। লাগেজ খুলে সব জিনিসপাতি গোছগাছ করতে থাকি। আমি আর মজুমদার মনের সুখে ‘আসো না’ গাইছিলাম। হঠাৎ দরজায় নক পড়ায় আমরা চুপ হয়ে যাই। দরজা খুলতেই শুভ উঁকি দিয়ে বললো, ‘মজা লস?’ আমাদের মুখে ওর গাওয়া গান শুনতে পেয়েই ও এসে হাজির হয়েছে।

শুভকে আমরা জানাই ডিনার খেয়ে আমরা ব্যাপক খুশি। আর মজুমদার বলে যে প্রতিদিন ১০০ রুপি ১০০ রুপি করে অ্যালাউয়েন্স দেওয়ার চাইতে আমাদের ব্যাপারগুলা ভালো হচ্ছে। এর আগে মানালির পার্টি, ডেজার্ট নাইট, আজকের মুভি আর ডিনার- এই গুলোই বেশি মজার। শুভ তখন বললো, ‘গোয়াতে গিয়ে এমন সারপ্রাইজ দিবো যে চোখে পানি চলে আসবে’। শুভ চলে গেলে আমরা লাগেজ গুছিয়ে শুয়ে পড়ি। আগামীকাল অনেক ‘শিক্ষনীয়’ জায়গায় যেতে হবে যার নাম CEPT।

 

 

The Mighty INDIA CALLING: পড়াশুনার শহর আহমেদাবাদ এবং হোটেল বিড়ম্বনা (পর্ব ২৩)

গোয়েলে এক বেলা ঘুম দিলে শরীরের তিনটা জায়গায় ব্যাথা করতে থাকে। এক নম্বর- ঘাড়, দুই নম্বর কোমর আর তিন নম্বর হাঁটু। এই তিনটা জায়গায় প্রথমে অল্প অল্প তারপর আস্তে আস্তে ব্যাথা বাড়তে থাকে। ব্যাথা করতে করতে যখন টনটন করতে থাকে তখন ঘুম ভেঙ্গে যায়। আমারও এরকম গভীর ঘুমের মধ্য থেকে  টনটনে ব্যাথার কারনে ঘুম ভেঙ্গে গেলো। আমি হালকা নড়াচড়া করে ব্যাথাটা কমিয়ে নিলাম। টের পেলাম ভোর হয়ে গেছে আর কোন এক রাস্তার ধারে আমাদের গোয়েল থেমে আছে। আমরা আহমেদাবাদ পৌঁছে গেছি। কমিটির লোকজন হোটেল খুঁজতে গিয়েছে। আমি আবার চোখ বুজে ঘুম দিতে লাগলাম।

একটু বেলা বাড়তেই বাসের লোকজন অল্প অল্প করে জেগে উঠতে লাগলো। ফিসফাস শুনতে পারছিলাম যে হোটেল পেতে নাকি সমস্যা হচ্ছে। একসময় সবাই জেগে উঠলাম। আমি ভালো করে চারপাশ তাকিয়ে দেখলাম। আমাদের বাস একেবারে একটা বড় রাস্তার পাশে পার্ক করা। রাস্তা দিয়ে হুশ করে বড় বড় বাস, প্রাইভেট কার যাচ্ছে। পাশেই ফ্রেশ হওয়ার মত একটা ছোট খাটো হোটেল আছে। অনেকেই নেমে  হাতমুখ ধুয়ে আসতে লাগলো। অনেকেই বাসেই গ্যাট মেরে বসে রইলো। জুবায়ের ওর কম্বলটা দিয়ে মুখটা ঢেকে বসে রইলো, দেখে মনে হচ্ছিলো ওটা শুধুই কম্বলের দলা। বাইরের হোটেল থেকে ফ্রেশ হয়ে তমা হ্যাভার স্যাকের সারি পার হয়ে সিটের দিকে আসতে লাগলো। জুবায়েরকে কম্বল মনে করে ও একবার ভুল করে জুবায়েরের মাথার ওপর হাত দিয়ে চিৎকার করে উঠলো। সবাই এক দফা হেসে উঠলো। কয়েক মিনিট পর নিশাতও ঠিক একই ভুল করে চিৎকার দিয়ে উঠলো। সবাই আবার হাসতে হাসতে গড়াগড়ি খেলো।

বাসে বসে আমরা অপেক্ষা করতেই লাগলাম। সেই অপেক্ষা আর শেষ হচ্ছে না। সত্যিই তাহলে আমাদের কমিটি হোটেল নিয়ে সমস্যায় পড়েছে। প্রায় দুই ঘন্টা অপেক্ষা করার পর সকাল দশটার দিকে শুভ বাসে সবার উদ্দেশ্যে বললো যে সত্যিই হোটেল পেতে সমস্যা হচ্ছে। কি এক বানিজ্য মেলা না কি যেন হচ্ছে এই শহরে। এই জন্য সব হোটেল বুকড। খালি পাওয়া যাচ্ছে না। কোন রকম একটা হোটেল পাওয়া গেছে কিন্তু সেখানে সবার জায়গা হবে না। কমিটি তাই বিশটা মেয়ে আর চারটা ছেলের নাম ঘোষনা করলো যারা এই হোটেলে যাবে। আর বাকিদের বাসে বসেই অপেক্ষা করতে হবে। এই বিশ জন মেয়ের মধ্যে আমার আর রুবাইদার নাম ছিলো। আমি ব্যাক প্যাক পিঠে নিয়ে নেমে পড়তে লাগবো এমন সময় দেখলাম মৌলির শরীর বেশ খারাপ কিন্তু ও নাম বলা হয় নাই। আমি অনেক বললাম যে আমি থেকে যাই আর ও চলে যাক, কিন্তু কিছুতেই ও রাজি হলো না। শেষমেষ কি আর করা, বাকিদের ফেলে রেখে আমরা নেমে পড়লাম বাস থেকে। আর ওদিকে অপেক্ষা করতে হবে শুনে জেরিন চটপট একটা মিনি প্যাক শ্যাম্পু খুলে মাথায় লাগিয়ে সেই হোটেলের হাত ধোয়ার বেসিনে গিয়ে মাথাটা ধুয়ে ফেললো। হোটেলের লোকজন অবাক হয়ে ওর দিকে তাকিয়ে রইলো।

আমি, রুবাইদা, মিম আর অন্তরা ১০০ রুপি দিয়ে অটো ভাড়া করলাম- নারোলের বিটিআরএস ওয়ার্ক শপের উল্টাপাশের ‘ত্রুপ্তি হোটেল’। আমরা গুটিসুটি মেরে উঠে বসলাম অটোতে। অনেক্ষন পর অটো আমাদের এক জায়গায় এনে নামিয়ে দিতে চাইলো। আমরা হোটেল কোথায় জানতে চাইলে রাস্তার ওপারে দেখিয়ে দিলো। আমরা দেখতে পেলাম ত্রুপ্তি হোটেলের সাইন বোর্ড। আমরা বললাম একটু ঘুরিয়ে নিয়ে আসতে। অটোওয়ালা কিছুতেই রাজি হলো না। সে বললো যে সে আমাদের রাস্তা পার করে দিবে- চিন্তার কিছু নাই। আমরা ভাড়া মিটিয়ে দিলাম। লোকটা অন্তরার ব্যাগটা নামিয়ে দিয়ে কোন ফাঁক দিয়ে পালিয়ে গেলো আমরা টেরই পেলাম না।  প্রচন্ড ব্যস্ত রাস্তা দিয়ে ফুল স্পিডে গাড়ি যাচ্ছে। এর মধ্যে মালপত্র নিয়ে দুই নম্বুরি অটোওয়ালাকে বকতে বকতে আমরা কোন রকম রাস্তা পার হলাম।

হোটেলের নিচ তলাটা খাবার হোটেল। একটা সিড়ি বেয়ে আমরা দোতলার কাউন্টারে পৌঁছালাম। সেখানে রাজিবের সাথে ম্যানেজারের কথা শুনলাম। উনি বার বার জানতে চাইছেন কতজন মেয়ে আছে আমাদের সাথে। আমি রাজিবকে জিজ্ঞেস করলাম কি কাহিনি? রাজিব বললো উনারা চেষ্টা করছেন একই হোটেলে সবাইকে রাখার জন্য। সবাই না হলেও অ্যাট লিস্ট সব মেয়েদের একসাথে জায়গা দেওয়া যাবে কিনা সেই হিসাব করছেন। আমিও শুনে খুশি হলাম। একটু কষ্ট হলেও সবাই যদি একসাথে থাকা যায় সেটাই ভালো। আমি, রুবাইদা, মিম আর অন্তরা একটা রুম পেলাম দোতলায়। রুমটায় ঢুকে একটু হতাশ হলাম। ছোট অন্ধকার রুম, কোন জানালা নাই। কেমন একটা বদ্ধ বোটকা গন্ধ। কিন্তু কি আর করা, থাকার জায়গা পেয়েছি এই তো বেশি। আমরা একে একে সবাই ফ্রেশ হয়ে নেই। তারপর খেতে নামি নিচের দিকে।

রিসিপশনের সামনে দেখা হয় মজুমদার, আর মৌলির সাথে। আমাদের বাকি সবাইকে এই হোটেলেই জায়গা দেওয়া হয়েছে, তবে বেসমেন্টে। যাই হোক সবাই আমরা একই হোটেলে আছি, এটাই বড় কথা। ওরা দুইজন পেয়েছে একটা ডবল রুম। ওরা আমাকে অফার দিলো ওদের রুমে চলে যাওয়ার জন্য। আমার মনে হলো অফারটা ভালো। রুবাইদাও বললো আমাকে ওদের রুমে চলে যেতে। যাই হোক আমরা নিচে নেমে খেতে বসি। খেতে বসে অর্ডার দেই ভেজ পোলাও। খাওয়াটা খুবই মজা আর দাম অনেক কম। মাত্র ৪০ রুপি। আশেপাশে আমাদের যারা খেতে বসেছিলো সবাই জানালো যে প্রত্যেকের আইটেমই ভালো। শান্তকে দেখলাম ৬ রুপি দিয়ে আইস্ক্রিমের কাপ খেতে। ভাদিলালের আইসক্রিম। এত্ত সস্তা দেখে আমারও খুব খেতে ইচ্ছা করলো। কিন্তু পরে আরেকজনের লাচ্ছি দেখে সেটাই অর্ডার দিলাম। সাদা ঘন গ্লাস ভর্তি লাচ্ছি, এর মধ্যে রুহ আফজা, বাদাম, জেলো আর আইসক্রিম দেওয়া। চামচ দিয়ে খেতে হয়। ৩৫ রুপির লাচ্ছিটা খুবই মজা খেতে।

দারুন মজার এক মগ লাচ্ছি
দারুন মজার এক মগ লাচ্ছি

খাওয়াদাওয়া শেষে আমি আমার রুম থেকে মালপত্র নিয়ে বেজমেন্টে মজুমদারদের রুমে চলে আসি। বেজমেন্টের সিড়িটা দিয়ে ঢুকলে হাতের বাম পাশে প্রথম রুমটাই আমাদের। এছাড়া বেজমেন্টের বাকি রুমগুলোতেও সব আমাদের লোকজন। পুরো বেজমেন্টে কেমন যেন একটা ঘরোয়া পরিবেশ তৈরি হলো। সবাই বেশ হৈচৈ করতে লাগলো। আমি ব্যাগট্যাগ নিয়ে রুমে ঢুকলাম। এই রুমটাও ছোট্ট, কোন জানালা নাই, কিন্তু সেই গুমোট বোটকা কোন গন্ধ নাই। মৌলি গোসল করছে আর মজুমদার অলরেডি গোসল করে ফেলেছে। আমি ব্যাগ খুলে আমার জিনিসপত্র বের করে রেডি হয়ে বসে রইলাম, মৌলি বের হলেই আমি ঢুকবো গোসল করতে। মৌলি বের হলে আমি গোসলে ঢুকি আর ওরা খাওয়ার জন্য বের হয়ে যায়। এইখানে গরম পানির ব্যবস্থা নাই, কিন্তু কলের পানিটাই আরামদায়ক তাপমাত্রার। আমি শান্তিমত গোসল করলাম।

গোসল শেষে নামাজ পড়ে নিলাম। তারপর আমি দোতলার রুমে রুবাইদার সাথে দেখা করতে গেলাম। ওরা তিন জনও রেডি। আমাকে দেখেই বের হয়ে পড়লো। আমরা রিসেপশনের লোকটাকে জিজ্ঞেস করলাম আশেপাশে দেখার মতন কি কি আছে। সব শুনে বুঝলাম সস্তায় কেনাকাটা করার মতন জায়গা আছে একটা যেটা আমরা শুনে বুঝতে পারলাম না। লোকটা কাগজে হিন্দীতে কি যান একটা লিখে দিলো। আমরা বললাম বুঝি নাই, ইংরেজিতে লিখে দিতে। লোকটা একটু অবাক হয়ে লিখে দিলো ‘Lal Darwaja’ আর ‘Khamasa’। বললো বাসেও যেতে পারি, অটোতেও যেতে পারি। সব শুনেটুনে আমরা নেমে পড়ি অটো ঠিক করতে।

অটোওয়ালা আর অন্তরার মোবাইলের ‘অ্যারাউন্ড মি’ অ্যাপসের মধ্যে আপস করে আমরা রওয়ানা দেই ‘তিন দরওয়াজা’ নামক জায়গার দিকে। অটোতে করে ঘুরতে ঘুরতে আমি চারপাশটা দেখতে থাকি। আহমেদাবাদে প্রচুর মুসলমান। আমার কাছে দেখে মনে হলো আহমেদাবাদটা অনেকটাই বাংলাদেশের মতন। মানুষজন, পোশাক পরিচ্ছদ, ঘরবাড়ি, অলিগলি, চিপাচাপা সবই আমার দেশের মতন মনে হলো। খালি রাস্তায় প্রচুর মোটর সাইকেল, আর মেয়ে মোটর সাইকেল চালক সংখ্যায় অনেক বেশি -যেটা আমাদের দেশে একেবারেই কম। সব মেয়েরা বিশেষ কায়দায় ওড়না দিয়ে মুখ আর চুল ঢেকে শুধু চোখ দুটো বের করে মোটর সাইকেল চালায়। প্রথমে দেখে আমি এটাকে হিজাব মনে করেছিলাম। কিন্তু পরে মনে হলো এটা মনে হয় ধুলা বালি থেকে মুখ বাঁচানোর উপায়। আমরা চিপাচাপা গলি দিয়ে যেতে থাকি। একসময় পাড়ার মসজিদ চোখে পড়ে। মুসল্লীরা দল বেঁধে বের হচ্ছে মসজিদ থেকে। কারুকাজ করে সাজানো বেশ কয়েকটা ঘোড়ার গাড়িও চোখে পড়লো। অনেক্ষন ঘুরেফিরে আমরা এসে থামলাম আমাদের গন্তব্যে।

আশেপাশে দেখে আমরা একটু ডান বামে তাকালাম। বেশ বিশাল বাজার বলেই মনে হলো। রাস্তার দুইপাশেই হকাররা বসে আছে। হকারদের বহর দেখে মনে হচ্ছে সামনে নিশ্চয়ই বিরাট কোন মার্কেট আছে। আমরা একদিক থেকে হাঁটা শুরু করলাম। প্রচুর হকার, প্রচুর ভিড়, ডাকাডাকি ধাক্কাধাক্কি – যেন পুরাই চাঁদনি চক গাউসিয়ার সামনের ফুটপাথ। সস্তা, চকচকে জিনিসপাতিতে ভরা চারপাশ। আমরা কোনমতে ভিড় ঠেলে ধাক্কাধাক্কি করে সামনে যেতে লাগলাম। কিন্তু কোন বড় মার্কেট আর দেখতে পাচ্ছিলাম না। কয়েকজনকে জিজ্ঞেস করলাম আমরা। জানতে পারলাম এখানে কোন বড় মার্কেট নাই, সবই রাস্তার হকার। আমাদের মন খারাপ হয়ে গেলো কারণ এইসব জিনিস তো আমরা কিনতে আসি নাই। রাস্তার এক ধারে দাঁড়িয়ে দিলাম খোঁজ অ্যারাউন্ড মিতে। অনেক চিন্তা ভাবনা করে আমরা ঠিক করলাম, যাবো আলফা ওয়ান শপিং মলে। অটো ঠিক করে রওয়ানা দিলাম ‘বস্ত্র পুর’ এর উদ্দেশ্যে।

এটা অনেক দূরের রাস্তা। আমরা আহমেদাবাদের পুরানো এলাকায় ছিলাম যেটা অনেকটা আমাদের পুরানো ঢাকার মত। এরপর একটা নদী পার হলাম যেটার নাম সবরমোতি। নদীটা পার হওয়ার পর থেকেই আমরা নতুন আহমেদাবাদ দেখতে পেলাম। নতুন চকচকে প্ল্যান করা শহর যেন বলে মনে হলো। ঠিক যেন আমাদের দেশের গুলশান বা বনানীর রাস্তাগুলো। সব ঝকঝকে দোকানপাট, ঝাঁ চকচকে দালান আর সাইন বোর্ড চোখে পড়তে লাগলো। বস্ত্র পুরে এসে যখন নামলাম আলফা ওয়ানের সামনে, সুন্দর চকচকে মার্কেটটা দেখে আমরা বেশ খুশি হয়ে গেলাম। বেশ বড় মলটা এল শেপের, বাইরে অনেক খোলা জায়গা, সেখানে অনেক গাড়ি আর মোটর সাইকেল পার্ক করা আছে। আমরা খুশি খুশি মনে ভিতরে ঢুকলাম।

নিচ তলায় বেশ বড় বড় লাইফস্টাইল স্টোর। আমরা সেরকম একটাতে ঢুকে গেলাম। অনেক বড় স্টোর। ঘুরতে ঘুরতে এখানে ফাস্ট ট্র্যাকের সেই ঘড়িটা পেয়ে গেলাম। সাথে আরও একটা গোবদা ঘড়ি ছিলো সেটাও পছন্দ হলো। দেশে ভাইয়াকে এস এম এস করে মডেল নম্বর পাঠালাম। ভাইয়া দেখে আমাকে আগের ঘড়িটাই সাজেস্ট করলো। বেশ কয়েকবার চিন্তা করলাম, ২০০০ এর মত রুপি খরচ করে এখনই ঘড়িটা কিনবো নাকি পরে ফেরার সময় কোলকাতা থেকে কিনে নিবো। এইসব চিন্তা মাথায় নিয়ে ঘুরতে লাগলাম। সুন্দর সুন্দর জামা কাপড় সাজানো আছে যেগুলো আমরা ঘুরে ঘুরে দেখতে লাগলাম। মিম আর অন্তরা কসমেটিক কিনলো। আমরা এই স্টোরের বাইরে অনেক সুন্দর সুন্দর জামাকাপড়ের দোকান দেখলাম। কয়েকটা দোকানে দেখলাম ৭০% ছাড় দেওয়ার পরও দাম আমার সাধ্যের বাইরে। এর মধ্যেও বিবা, ফ্যাব ইন্ডিয়া, হ্যাম্লিস, এইসব দোকানে পারফিউম, কস্মেটিক্স, খেলনা এইগুলো আমরা দেখতে লাগলাম। এই দোকান ঐ দোকান দেখতে দেখতে কখন যে সন্ধ্যা গড়িয়ে রাত হয়ে গেছে তা টের পাই নাই আমরা। দামি এই মার্কেটে ঘুরতে ঘুরতে আমার মনে হলো এখানকার জিনিস অনেক সুন্দর এবং একইসাথে দামও অনেক চড়া। এরই মধ্যে পেয়ে গেলাম একটা ফাস্ট ট্র্যাকের শোরুম। এইবার আমি সিদ্ধান্ত নিলাম, যা আছে কপালে- কিনে ফেলি ঘড়িটা। ঘড়িটা কিনে খুশি খুশি মনে গেলাম খাওয়া দাওয়া করতে ‘সাবওয়ে’ তে।

সাবওয়ের লোভনীয় ননভেজ মেনুগুলো বাদ দিয়ে আমি আর রুবাইদা অর্ডার দিলাম ১৩০ রুপির ভেজ আইটেম ‘চানা চটপটা’। রুবাইদার সেরকম ভালো না লাগলেও আমার কাছে খাবারটা পছন্দই হয়েছিল। পেট ভরে খেয়ে দেয়ে আমরা বের হলাম সাবওয়ে থেকে। মোটামুটি রাত ৮ টা বেজে গেছে। নিচে নেমে গেটের সামনে দাঁড়িয়ে আমরা অটো ঠিক করতে লাগলাম। অন্তরা চিৎকার করে ডাকতে লাগলো, ‘ও ভাইসাব, নারোল জাওগি কেয়া? চান্দোলা লেক, বি আর টি এস ওয়ার্কশপকে পাস?’। বেশিরভাগ অটোওয়ালাই যেতে চাইলো না। তারপর কোনরকম একটা অটো রাজি হওয়ার সাথে সাথেই আমরা উঠে পড়ি।

পুরো ইন্ডিয়াতে আমি বেশিরভাগ অটোতেই কারও না কারও কোলে চড়ে পার করেছি। আহমেদাবাদ আসার পর থেকেই রুবাইদার কোলে বসেই সারাদিন ঘোরাঘুরি করা হয়েছে। এবারও তাই হলো। আমরা গাদাগাদি করে বসলাম। অটো আমাদের নিয়ে ছুটতে লাগলো পুরানো আহমেদাবাদের দিকে। আমি গলা বাড়িয়ে দেখতে লাগলাম হলুদ সোডিয়াম আলোতে উদ্ভাসিত রাতের আহমেদাবাদ শহরকে। রাস্তা ভর্তি গাড়িঘোড়া, রাতেও প্রচুর মানুষজন চারপাশে। আমরা নিজেদের মধ্যে কথাবার্তা বলতে লাগলাম। আমাদের কথা শুনে অটোওয়ালা কি কি সব বলতে লাগলো, আমরা কিছুই বুঝতে পারলাম না। এখানকার লোকজনের ভাষায় হিন্দীর সাথে গুজরাটি ভাষা মিশানো থাকে। গুজরাটি টোনের হিন্দী আমাদের বুঝতে অনেক কষ্টই হয়। আমরা কোনরকম হ্যাঁ, না- এসব বলে বলে টাইম পাস করতে লাগলাম।

ওদিকে অটোওয়ালা অনেক দূর গিয়ে এক জায়গায় এসে আমাদের জিজ্ঞেস করতে লাগলো যে আমাদের হোটেল আর কত দূর, উনি নাকি রাস্তা চিনেন না। আমাদের মেজাজটা গেলো খারাপ হয়ে, ব্যাটা যদি আগে বলতো যে উনি রাস্তা চিনে না তাহলে তো উনাকে আমরা নিতাম না। আমরা বললাম উল্টা পালটা না গিয়ে রাস্তার কাউকে জিজ্ঞেস করে নিতে। উনি এক দোকানে গিয়ে জিজ্ঞেস করে বললো যে এটা নাকি আরও সামনে আর এজন্য ওনাকে আরও ২০-৩০ রুপি এক্সট্রা দিতে হবে। সব শুনে আমাদের মেজাজ বেশ খারাপ হয়ে গেলো অটোওয়ালার উপর। আমরা সেই মূহুর্তেই ভাড়া পরিশোধ করে অটো থেকে নেমে পড়লাম। তারপর পায়ে হাঁটা শুরু করলাম। প্রায় ১০-১৫ মিনিট হেঁটে আমরা পেয়ে গেলাম আমাদের ‘ত্রুপ্তি হোটেল’। সেই সকাল থেকেই আমাদের অভিজ্ঞতা থেকে আমরা টের পেলাম আহমেদাবাদ শহরের একমাত্র বিরক্তিকর জিনিস হচ্ছে ‘অটো’ আর ‘অটোওয়ালা’।

হোটেলে ফিরে বেজমেন্টের সিড়ি দিয়ে নিচে নেমে আমার রুমের দরজা খুললাম আমি। মজুমদাররাও ফিরে আসলো কিছুক্ষনের মধ্যে। ওদিকে হিমি, শুভ, সীমান্ত, ইশতিয়াক ওরা সবাই ওদের রুমের চাবি নিয়ে রুমমেট না আসা পর্যন্ত আমাদের রুমে বসে অপেক্ষা করতে লাগলো। আমাদের ছোট রুমটা হাসিতে আর আড্ডায় গমগম করতে লাগলো। আহমেদাবাদে এসে মোবাইলে নেটের হাই স্পিড পেয়ে অনেকেই বাসায় ভিডিও কনফারেন্স করে ফেলেছে। আমি রুম থেকে বের হয়ে বেসমেন্টের সিড়িতে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে বাসায় ভিডিও কল দিলাম। অনেক দিন পর বাসার সবার চেহারা দেখলাম। আমার ছোট্ট ওয়াফি গোলাপি ফ্লানেলের জামা পরে আমার দিকে ড্যাব ড্যাব করে তাকিয়ে রইলো। অনেক্ষন ধরে কথা বললাম বাসার সবার সাথে। আমার বেজমেন্টের রুমটা দেখালাম। বাসার সবাই দেখলো আমার রুম ভর্তি মানুষজন গল্প গুজব করছে!

সবাই আস্তে আস্তে চলে গেলো আমাদের রুম ছেড়ে। পরেরদিন আমাদের মুভি দেখতে যাওয়ার এবং ডিনারের প্ল্যান সবাইকে রুমে রুমে এসে জানিয়ে দেওয়া হলো। কিছুক্ষণ গল্প গুজব করে আমরা লাইট নিভিয়ে ফ্যান ছেড়ে ঘুমিয়ে পড়লাম।