ম্যারিকা দেশে ভ্রমন (পর্ব ১) : প্রথম দিনের অ্যাডভেঞ্চার

‘So, this is the first time, you are visiting USA! ’

Yah…..

‘What’s the purpose of your visit?’

মেজাজটা খিচড়ে গেলো, আমি যেই কারণেই যাই তাতে তোমার কি? কিন্তু মুখে এমিরাটসের অফিসারকে কিছু বলতে পারলাম না। মিষ্টি হাসি দিয়ে বললাম, ‘I am going to accompany my husband’.

মহিলা অফিসারটি আরও উৎসাহী হয়ে জিজ্ঞেস করলো, ‘Where is he?’

আমি আঙ্গুল তুলে দেখিয়ে দিলাম, ‘There he is’

এইবার আর কিছু জিজ্ঞেস না করে মহিলা বোর্ডিং পাস দিয়ে বললো, ‘Have a great Day’

আমি পাসপোর্ট   হাতে নিয়েই ভিতরে ঢুকে পড়লাম।

দুবাই এয়ারপোর্টে সেই ভোরে ফজরের আজানের সময় এসে পৌছেছি। ঘন্টা চারেকের বিশ্রাম নিয়ে পরবর্তী ফ্লাইটের জন্য চেক ইন করে ফেললাম। বোর্ডিং পাস নিয়ে নানা রকম সিকিউরিটি চেক করে ওয়েটিং চেয়ারে এসে বসলাম। বাইরে কাঁচের স্ক্রিনের ওপাশে দাঁড়িয়ে আছে এয়ার বাস A38000, রাজকীয় ভঙ্গিতে। দূরে ঝকঝকে দিনের আলোয় দেখা যাচ্ছে দুবাই শহরের ব্যস্ত রাস্তা। একটু ছোট্ট করে দীর্ঘশ্বাস ফেললাম, এই প্লেনে করে আগামী তের ঘন্টা আকাশে উড়তে হবে- যা তা কথা নাকি!

ঐ দেখা যায় এমিরাটসের দোতলা এয়ারবাস

কোন রকম ডিলে ছাড়াই আমরা যাত্রা শুরু করলাম। আরামদায়ক সিট, একটু পর পর মজাদার খাবার, পুতুলের মতন বিমানবালা, টিভিস্ক্রিনে বিদেশি চলচ্চিত্র – সব মিলিয়ে ভালোয় ভালোয় কেটে গেলো প্রায় তের ঘন্টা। সামান্য কয়েক মিনিট ডিলে করে আমরা পৌঁছে গেলাম বোস্টন বিমান বন্দরে।

প্রায় ঝামেলাবিহীন ইমিগ্রেশন শেষ করে লাগেজের ক্যারোসেলে গিয়ে দাঁড়িয়ে রইলাম আমরা। ঘন্টা খানেকের বেশিই লাগলো লাগেজ ফিরে পেতে। যাই হোক সবগুলো লাগেজ নিয়ে ট্রলিতে উঠিয়ে আমরা যখন বের হবো হবো ভাব- তখন কোথা থেকে এক পুলিশ এসে কাস্টমসে চেক করার জন্য লাগেজ দিতে বললো। আমরা বিনা বাক্যে লাগেজ দিয়ে দিলাম স্ক্যানিং মেশিনের ভিতর। আবার সেখান থেকে সব লাগেজ বের করে ট্রলিতে উঠিয়ে ঠেলে ঠেলে সামনে যেতে লাগলাম। পথিমধ্যে এক মহিলা উদয় হয়ে এমিরাটসের একটা কাউন্টার দেখিয়ে বললো আমাদের লাগেজ এখানে জমা দিতে। এটা সরাসরি আমাদের পরবর্তী ডোমেস্টিক প্লেন জেট ব্লুতে চলে যাবে। কিছু না বুঝেই লাগেজ দিয়ে দিলাম। আমাদের মুখে বলে দিলো টার্মিনাল সি-তে যেতে। হ্যান্ড লাগেজ নিয়ে আমরা টার্মিনাল সি খুঁজতে বের হলাম।

বোস্টন এয়ারপোর্ট অন্য এয়ারপোর্টের চাইতে একটু অন্যরকম। এখানকার সাইনেজগুলো ঠিকমত বুঝতে পারছিলাম না। টার্মিনাল সি কোথায় খুঁজতে যেয়ে আমাদের প্রায় কালো ঘাম ছুটে গেলো। একবার সাইনেজ দেখে লিফটে চড়ে তিনতলায় গিয়ে হাজির হলাম। আবার সেখান থেকে নেমে একতলায় এসে এক পুলিশকে জিজ্ঞেস করলাম। পুলিশ আমাদের ইন্টারন্যাশনাল টার্মিনাল থেকে বের করে ডোমেস্টিকে যাওয়ার এক রহস্যজনক পথ দেখিয়ে দিলো। প্রায় আধা ঘন্টা হাঁটার পর আমরা ডোমেস্টিকের এক জায়গায় ভীড় করে সিকিউরিটি চেক ইন হতে দেখলাম। তবে এই চেক ইন করছে পুলিশ সদস্যরা। আমরাও অন্য সবার সাথে লাইনে দাঁড়িয়ে সিকিউরিটি চেক করালাম। সমস্ত ব্যাগ জমাদিলাম, ল্যাপ্টপ বের করে দিলাম, ঘড়ি, জুতা -সব খুলে দিলাম। ব্যাপক চেক হওয়ার পর আমরা খুঁজতে লাগলাম জেট ব্লুর কাউন্টার। বিশাল একটা ডিস্প্লে বোর্ডে প্রথমবারের মতন ডিপার্চার আর অ্যারাইভালের লিস্ট দেখতে পেলাম। আমার কেমন যেন অদ্ভূত লাগছিলো- এটা কোন এয়ারপোর্ট হলো নাকি, সাইনেজ ঠিক মত বুঝা যায় না, সারাটা এয়ারপোর্ট পাড়ি দিয়ে এতক্ষণে একটা ডিস্প্লে বোর্ড চোখে পড়লো!

আরও মিনিট পনের হেঁটে আমরা যেয়ে পৌঁছালাম আমাদের কাংখিত ডিপার্চার লাউঞ্জে। প্লেন অন টাইমে আছে, বড়জোর নাকি আধা ঘন্টা ডিলে হতে পার। আমরা হাঁপ ছেড়ে বাঁচালাম। উফফ, যাক শান্তি! ওয়েটিং চেয়ারে গা এলিয়ে দিয়ে বিশ্রাম নিতে লাগলাম। সেই কোন সময় দুবাইয়ে সূর্যোদয় দেখেছিলাম আর এখনও এখানে কটকটে দূপুরের রোদ! শরীরে ক্লান্তি এসে ভর করলো। কত ঘন্টা যে ঘুমাই না- কে জানে? মনে মনে ভাবলাম, এইতো আর কয়েক ঘন্টা পর শেষ হবে এই বিশাল যাত্রা, কিন্তু তখন কি আর জানি যে কত চমক অপেক্ষা করছে আগামী কয়েক ঘন্টায় আমাদের জন্য!!

হঠাৎ মোবাইলে খবর এলো,’ ফ্লাইট নাকি ডিলে?’ আমরা নড়েচড়ে উঠলাম। ডিস্প্লে বোর্ডের দিকে তাকিয়ে দেলহলাম সত্যিই তো, পাঁচ ঘন্টা ডিলে দেখাচ্ছে এখন। কাউন্টারের সামনে বিশাল লাইন। জিজ্ঞেস করা হলো, ব্যাপার কি? জানলাম সত্যিই ডিলে পাঁচ ঘন্টা। ওয়েদার নাকি খারাপ। থান্ডার স্টর্ম হচ্ছে। আশেপাশে তাকিয়ে দেখলাম মূহুর্তেই কয়েকটা ফ্লাইট বাতিল হয়ে গেলো। খুব কম সময়ের মধ্যেই লাইঞ্জের সবগুলো চেয়ার ভর্তি হয়ে গেলো। প্রচুর মানুষ চেয়ারে বসতে না পেরে কার্পেটের উপর হাত পা ছড়িয়ে বসে পড়লো। এমনকি আমরা যেখানে বসা ছিলাম, সে জায়গাটাও অন্যদের দখলে চলে গেলো।

এয়ারপোর্টের ওয়াইফাই কানেক্ট করে দেশে কথা বলার চেষ্টা করা হলো। শত শত মানুষ আমাদের মতনই কথা বলার চেষ্টা করে যাচ্ছে, তাই নেটের অবস্থা খুবই খারাপ। নর্থ ক্যারোলাইনাতে মেঝো মামার সাথে যোগাযোগ করা হলো। মামা জানালেন এক আশঙ্কার কথা- ফ্লাইটটা ক্যান্সেল হয়ে যেতে পারে। বোস্টনে ঝুমুর খালামনির সাথে যোগাযোগ করা হলো। সব শুনে খালামনিও চিন্তিত হয়ে পড়লেন, ফ্লাইট ডিলে না ক্যান্সেল বোঝা না যাওয়া পর্যন্ত কিছুই করা যাচ্ছে না। লাউঞ্জ ভর্তি তখন অসহায় মানুষ, কারও ফ্লাইট ডিলে, কারও ফ্লাইট ক্যান্সেল। সবাই চিন্তিত মুখে ঘুরে বেড়াচ্ছে।

ওদিকে খবর নেওয়া হলো ফ্লাইট আরও ডিলে হয়ে যেতে পারে এমনকি বাতিলও হয়ে যেতে পারে। ওদিকে রাত নেমে পড়েছে। রাতুল শুকনো মুখে ছোটা ছুটি করছে এদিক সেদিক। কি করবো? নিজেরাই আজকের ফ্লাইট বাতিল করে পরের কোন ফ্লাইট নিবো? নাকি অপেক্ষা করবো আরও রাত পর্যন্ত- তাহলে তখন যদি ফ্লাইট বাতিল হয় তখন কি করবো? কিছুতেই কোন ডিসিশন নিতে পারছিলাম না।

অবশেষ আমাদের সকল জল্পনা কল্পনার অবসান ঘটিয়ে সকল সিদ্ধান্থীনতাকে দূর করে দিতে আসলো এক তথ্য, ফ্লাইট ক্যান্সেল! রাতুল যখন জেট ব্লুর কাউন্টারে দাঁড়িয়ে থাকা মহিলাকে বললো যে, ‘ফ্লাইট তো ক্যান্সেল, এখন কি করবো?’ তখন মহিলা মাথা নেড়ে বললো, ‘উহু, তোমাদের ফ্লাইট ডিলে। ক্যান্সেল না’। তখন রাতুল ডিস্প্লে বোর্ডের দিকে আঙ্গুল তুলে বললো, ‘ওইখানে দেখো, ফ্লাইট ক্যান্সেল’। মহিলা হাঁ হয়ে গেলো। বললো, ‘তাই তো দেখছি, তোমাদের ফ্লাইট ক্যান্সেল!’। এখন আমাদের নতুন করে টিকেট রিশিডিউল করতে হবে। মহিলা ঘাটাঘাটি করে বললো, আগামীকাল ভোর ছয়টার ফ্লাইট আছে। আমরা সেটাতেই রাজি হয়ে গেলাম। কিন্তু কি বোর্ডে অনেকক্ষণ টেপাটেপি করে মহিলা বললো, ‘আমি এখান থেকে করতে পারছি না, তোমরা বরঞ্চ জেট ব্লুর হেল্প কাউন্টারে যাও। একটা আছে লাউঞ্জের বাইরে। তবে এটাতে অনেক ভীড় হবে এখন। আরেকটা আছে সিকিউরিটি চেক ইনের বাইরে। তোমরা সেটাতে চলে যাও। সেটাতে ভীড় কম হবে।‘ আমরা হ্যান্ড লাগেজ নিয়ে প্রথমে বের দেখতে হলাম  সিকিউরিটি চেক ইনের ওপারের কাউন্টার। দীর্ঘ রাস্তা হেঁটে দেখলাম এখান থেকে একবার বের হলে আর ঢোকা সম্ভব না। আবার দীর্ঘ পথ পাড়ি দিয়ে আসলাম লাউঞ্জের বাইরের কাউন্টারে। সত্যিই সেখানে বিশাল লম্বা লাইন। লাইনে দাঁড়িয়ে পড়লাম। তারপর ইতস্তত করতে লাগলাম, কি করবো? এখানেই দাঁড়িয়ে থাকবো নাকি বাইরে চলে যাবো? একবার বের হলে আর ভিতরে ঢোকা যাবে না। এখানে তো সুন্দর বসার যায়গা আছে। বের হয়ে গেলে সারা রাত কোথায় থাকবো?

সাত পাঁচ ভেবে সিদ্ধান্ত নিলাম বাইরের কাউন্টারেই যাই, যা আছে কপালে। আবার দীর্ঘক্ষণ হেঁটে এক্সিট লিখা রাস্তা দিয়ে বের হয়ে আসলাম। তারপর হেঁটে হেঁটে গেলাম হেল্প ডেস্কে। এখানে ভীড় তুলনামূলক কম। লাইন ধরে দাঁড়িয়ে পড়লাম। কিছুক্ষণ পরেই জেরেমি নামের একজন অফিসারের সামনে গেলাম। আমরা খুলে বললাম যে ফ্লাইট রিশিডিউল করতে চাই। সে কিছুক্ষণ স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে কয়েকটা অপশনের কথা বললো, তারপর থমকে গেলো। আমরা তার দিকে তাকিয়ে বুঝতে পারছিলাম যে কিছু একটা সমস্যা আছে। সে অবাক হয়ে বললো, ‘আশ্চর্য! আমি তোমাদেরকে এক ফ্লাইটে রিশিডিউল করতে পারছি না! কেন এমন হবে?’ আমরা ফ্যালফ্যাল করে তার দিকে তাকিয়ে রইলাম। কি সমস্যা, কেন সমস্যা, কোথায় সমস্যা- কিছুই বুঝতে পারলাম না।

জেরেমি অনেকক্ষণ গবেষণা করে যেটা জানালো তার সারমর্ম এরকম, আমাদের দুইটা টিকেটের একটা টিকেট ওয়ান ওয়ে আরেকটা টিকেট রিটার্ন। এজন্য ওদের পিএনআর নম্বর আলাদা। টিকেট রিশিডিউলের সময় সফটওয়ার অটোমেটিক আমাদের দুইজনকে দুইটা আলাদা ফ্লাইটে বরাদ্দ দিচ্ছে কারণ ও বুঝতে পারছে না যে আমরা একসাথে টিকেট কেটেছি। এটার কোন সমাধান জেট ব্লু  করতে পারবে না। আমরা যেহেতু এমিরাটস থেকে টিকেট কেটেছি, তাই এমিরাটসের অফিসে এখন আমাদের যোগাযোগ করতে হবে- যদি ওরা কিছু করতে পার! সমস্যাটা বুঝতে আমাদের বেশ অনেকক্ষণ সময় লাগলো। এইরকম একটা সমস্যা কারও হতে পারে এইটা আমাদের জানা ছিলো না।  জেরেমির পরামর্শ মেনে আমরা রওয়ানা দিলাম ইন্টারন্যাশনালের টার্মিনালের দিকে- গন্তব্য এমিরাটসের কাউন্টার।  আমরা যাওয়ার সময় জেরেমি আমাদের বলে দিলো, ‘তোমরা তোমাদের লাগেজ নিয়ে নিও, ওগুলো নিচে ফেরত দিয়ে দেওয়া হয়েছে।‘

দুপুরবেলা যে পথ দিয়ে ঘোরাঘুরি করে ইন্টারন্যাশনাল থেকে ডোমেস্টিকে এসেছিলাম, সেই একই পথ পাড়ি দিয়ে আবার ডোমেস্টিক থেকে ইন্টারন্যাশনালে এসে পড়লাম। প্রায় চল্লিশ মিনিট হেঁটে দুইজনেই কিছুটা ক্লান্ত হয়ে গিয়েছিলাম, কিন্তু দম ফেলার সময় ছিলো না। এমিরাটসের কাউন্টারে যাওয়ার আগে যেখানে আমরা লাগেজ জমা দিয়েছিলাম সেখানে একবার ঢুঁ মারলাম। একজন লোককে বসে থাকতে দেখে তাকেই পাকড়াও করলাম। লোকটা আমাদের সমস্যা শুনে অদ্ভূতভাবে তাকিয়ে রইলো। এরকম কোন সমস্যা হতে পারে এটা সে কোনদিন শুনে নাই। খানিকক্ষণ চিন্তা করে আমাদের বললো এমিরাটসের অফিসে যেতে। আমরা আবার হাঁটতে লাগলাম এমিরাটসের অফিসের দিকে।

লিফট দিয়ে তিনতলায় উঠে পেয়ে গেলাম এমিরাটসের চেক ইন কাউন্টারের সারি। কিন্তু বিধি বাম! কোন জনমনিষ্যি কেউ নাই, একেবারে ফাঁকা।  ডিস্প্লেতে তাকিয়ে দেখলাম এমিরাটসের একটা ফ্লাইটে বোর্ডিং হচ্ছে। নেক্সট কোন ফ্লাইট লিস্টে নাই। এদিক ওদিক খুঁজলাম, এমিরাটসের কাউকে পেলাম না। আবার লিফটে করে নিচে নেমে আসলাম। সেই আগের ভদ্রলোককে গিয়ে বললাম যে কোন লোককে পাই নাই এমিরাটসের অফিসে। আমাদের দেখেই ভদ্রলোক তড়িঘড়ি করে ব্যাগ গুছিয়ে বের হয়ে যেতে লাগলেন। বললেন, ‘আমার স্ত্রী অপেক্ষা করছে, বাসায় যেতে হবে।’ আমরা তাকিয়ে তাকিয়ে ভদ্রলোককে চলে যেতে লাগলাম।  

অল্প শোকে কাতর/ অধিক শোকে পাথর – আমাদের অবস্থা হয়েছে অনেকটা সেইরকম।  আমাদের গত চল্লিশ ঘন্টা কোন ঘুম হয় নাই, ডোনেস্টিক ফ্লাইটটা ক্যান্সেল, ডিপার্চার লাউঞ্জ থেকে বের হওয়ার পর কোথাও বসতে ফুরসত পাই নাই, নাই কোন ফোন, এই টার্মিনাল থেকে দৌড়ে অন্য টার্মিনালে যাচ্ছি, নতুন কোন টিকেট পাচ্ছি না, টিকেট পেলেও দুইজনে দুই ফ্লাইটের টিকেট পাবো, সেটাও কবে পাবো তার গ্যারান্টি নাই, তত ঘন্টা (নাকি দিন?) কোথায় থাকবো সেটাও জানিনা- এর চেয়ে খারাপ অবস্থা আর কি হতে পারে? প্রথম যখন ফ্লাইট ক্যান্সেল হলো তখন একটু চিন্তায় পড়ে গিয়েছিলাম, এখন এত এত বিপদে আছি যে এখন আর কোন চিন্তাই লাগছে না।  মাথাটা কেমন যেন হালকা হালকা ফুরফুরা লাগছে।  যা দেখছি সেটাতেই হাসি পাচ্ছে।  আমরা একজন আরেকজনকে দেখাতে লাগলাম ঐ দেখ, আমরা এখানে বসে রাত কাটিয়ে দিতে পারি। এমন কি কোন জায়গার তাপমাত্রা আরামদায়ক, কোন জায়গা থেকে বাথরুম কাছে সে সবও আমরা হিসাব করছিলাম!

হাঁটতে হাঁটতেই এক জায়গায় আমাদের লাগেজগুলো পড়ে থাকতে দেখলাম।  ওদের দেখে একটা দীর্ঘ শ্বাস ফেললাম। আমাদের টিকেট না হওয়া পর্যন্ত আমাদের দৌঁড়াদৌড়ি শেষ হবে না। তাই ওদেরকে সাথে করে নিতে পারলাম না।  ওরা পড়েই রইলো আর আমরা দীর্ঘ পথ হেঁটে জেরেমির সাথে কথা বলার জন্য আবার বিশাল লম্বা লাইনে দাঁড়ালাম।  এরই ফাঁকে ফাঁকে বাংলাদেশে আমাদের দুই বাসায়, নর্থ ক্যারোলাইনায় মেজো মামার বাসায় আর বোস্টনে ঝুমুর খালামনির বাসায় দূর্বল ওয়াই ফাই দিয়ে কোন রকম কথা চালাচ্ছিলাম।  ঘন্টা খানেক ধরে লাইনে দাঁড়িয়ে থাকার পর আবার জেরেমির সামনে গিয়ে দাঁড়ালাম।  আমরা বললাম যে কোন লাভ হয় নাই, এখন জেরেমিকেই আমাদের উদ্ধার করে দিতে হবে। জেরেমি আবার ভ্রূ কুঁচকে কিছুক্ষণ কি বোর্ডে টেপাটেপি করলো, ঠিক সেই মূহুর্তেই মেজো মামা ফোন দিলো।  মামা জানালেন যে উনি এমিরাটসের অফিসে ফোন দিয়ে আমাদের ব্যাপারটা সমাধান করে দিয়েছেন।  তখন জেরেমিও বলে উঠলো, ‘তোমাদের নামে তো আমি বুকিং দেখতে পাচ্ছি শুক্রবার সকাল ৬টার ফ্লাইটে!’ আমরা হাঁপ ছেড়ে বাঁচলাম।  জেরেমি এক গাল হেসে বললো, ‘আমি বলেছিলাম না যে এমিরাটসই পারবে- ঠিক হলো তো আমার কথা!’।  আমরা ওকে বললাম আমাদের বোর্ডিং পাস দাও। জেরেমি জানালো এত আগে বোর্ডিং পাস দেওয়া সম্ভব নয়। ওদিকে প্রিন্ট করাও সম্ভব না কারণ প্রিন্টের কোন অপশন নাই।  তবে ও আমার বোর্ডিং পাসের পিছনে আমাদের পিএনআর নম্বর লিখে দিলো আর আশ্বস্ত করলো যে কোন সমস্যা নাই, শুক্রবার তিন ঘন্টা আগে এসে চেক ইন করলেই বোর্ডিং পাস দিয়ে দিবে।  আমরা আরও বললাম যে, তোমরা তো কোন কম্পেন্সেশন দিচ্ছো না, আমরা তো বিদেশি, কিচ্ছু চিনি না, আমাদের অ্যাটলিস্ট হোটেলটা ঠিক করে দাও।‘ জবাবে জেরেমি বিনয়ের সাথে বললো, ‘আসলে এত রাশ এখন, আমরা চাইলেও তোমাদের কোন হোটেল দিতে পারবো না। সব হোটেল ফুল, কোথাও কোন খালি জায়গা নাই।‘

যাই হোক, টিকেট হয়েছে শুনে মনটা একটু শান্ত হলো। আমি রাতুলকে বললাম,’চল, একটু বসি’।  লম্বা পথ হেঁটে দীর্ঘ কতক্ষণ পর একটা চেয়ারে বসলাম আমরা সেটা বলতে পারবো না।  এদিক সেদিক তাকিয়ে দেখলাম সব খাবার দোকান বন্ধ হয়ে যাচ্ছে।  ওদিকে মামা ফোন দিয়ে বললেন, একটা হোটেল ঠিক করেছেন আমাদের জন্য। আমি চেয়ারে গা এলিয়ে দিয়ে বসলাম। এই চেয়ার ছেড়ে আর নড়তে ইচ্ছা করছিলো না। আবার একটু পর মামা ফোন দিয়ে বললেন যে, হোটেলটায় কাস্টোমারের ক্রেডিট কার্ড দিয়ে পে করতে হবে। অন্য কেউ পে করে দিলে হবে না। আমাদের কাছে যেহেতু ক্রেডিট কার্ড নাই, তাই আমরা ওখানে থাকতে পারবো না।  মামা এখন অন্য অপশন খুঁজছেন।  আমরা একজন অন্যজনের দিকে তাকিয়ে হাসলাম, আমাদের মাথা ঠিক মত কাজ করছিলো না। হোটেল পাই বা না পাই- কি আসে যায় তাতে?

মাঝরাতে বোসটন এয়ারপোর্টে আমাদের লাগেজসমূহের ছোটখাটো পাহাড়

চেয়ার ছেড়ে উঠে আমরা একটা দোকানে গেলাম। প্রায় তিন গুণ দাম দিয়ে চিপস আর বিস্কুট কিনলাম।  তারপর হেঁটে নেমে গেলাম নিচ তলায়। সেখানে খুঁজে খুঁজে আমাদের ব্যাগগুলো বের করলো রাতুল।  আবার মামা ফোন দিয়ে জানালেন যে একটা হোটেল পেয়েছেন আমাদের জন্য। নাম ঠিকানা পাঠিয়ে দিলেন। আমরা সমস্ত ব্যাগ পত্র নিয়ে এয়ারপোর্ট থেকে বের হয়ে আসলাম। বাইরে দেখি সবাই লাইন ধরে দাঁড়িয়ে আছে ট্যাক্সির জন্য।  আমরাও লাইনে দাঁড়ালাম। অবশেষে একটা ভ্যান (যেটা আমাদের দেশের মাইক্রোবাসের ছোট ভার্সন) পেলাম। উঠে ড্রাইভারকে ঠিকানা মুখে বলা হলো, কিন্তু ড্রাইভার বুঝলো না। তারপর মামার পাঠানো ম্যাসেজটাই দেখানো হলো। এবার ড্রাইভার বললো যে সে বুঝেছে। অন্ধকার বোস্টনের রাস্তায় রাত সোয়া দুইটার সময় আমাদের গাড়ি শাঁই শাঁই করে চলতে লাগলো।  আমার মনে হলো প্রায় এক যুগ কেটে গেছে, বেশ কিছুক্ষণের ঘুমিয়েও পড়েছিলাম আমি। তারপর যখন দেখি কোর্টিয়ার্ড বাই ম্যারিয়টে এসে পৌঁছালাম তখন মাত্র আধা ঘন্টা পার হয়েছে মোটে। হোটেলে কেউ আমাদের এগিয়ে নিতে আসলো না। দরজার সামনে ট্রলি রাখা। আমরা নিজেরাই ট্রলিতে লাগেজ রেখে ঠেলে ঠেলে নিয়ে ভিতরে ঢুকলাম। রিসেপশনের ভদ্রলোক আমাদের রুমের চাবি বুঝিয়ে দিলেন। আমরা ট্রলি নিয়েই লিফটে উঠে খুঁজে খুঁজে রুম বের করলাম।  রুমে গিয়ে কোন রকম দেশে ফোন দিলাম। হ্যান্ড লাগেজটা খুলে ঘুমানোর কাপড় বের করে একটু ফ্রেশ হয়েই বিছানায় গিয়ে পড়ে গেলাম। এক্কেবারে গভীর ঘুমে অচেতন………  

অত্যন্ত ক্লান্ত না থাকলে দিন শেষে হয়তো একটু ভেবে দেখতে পারতাম, সারা দিনের সমস্ত অ্যাডভেঞ্চারের সারমর্ম। গত দেড়দিন ধরে ঢাকা-দুবাই ঘুরে বোস্টন থেকে নর্থ ক্যারোলাইনা না গিয়ে অনেক কাহিনী কিচ্ছার পর আমাদেরকে বোস্টনেই থিতু হতে হলো একদিনের জন্য। একটা হোটেলে এসে নরম বিছানা পাবো ঘুমাবার জন্য একথাটা একটু আগেও স্বপ্নের মতন মনে হচ্ছিলো। ঘুমিয়ে না গেলে নিজেকেই হয়তো পিঠ চাপড়ে নিজে বলতাম, ‘Welcome to America! And well done for the very first time….’

2 Replies to “ম্যারিকা দেশে ভ্রমন (পর্ব ১) : প্রথম দিনের অ্যাডভেঞ্চার”

  1. Onek valo laglo Tanni. Shundor guchano ar spontaneous likha. Agei porsilam, ajke comment korlam. Next part er opekkhay thaklam. Best wishes from bhaiya! Smile
    – Reezvi

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *